
দেশের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পর্যটন সম্পদকে পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পে রূপ দিতে দীর্ঘমেয়াদি Tourism Master Plan চূড়ান্ত করার কাজ করছে সরকার। পরিকল্পনায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণ ও গন্তব্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন জাতীয় পর্যটন নীতি ২০২৬, বড় আকারের উন্নয়ন প্রকল্প এবং পর্যটনের অর্থনৈতিক অবদান নিরূপণে Tourism Satellite Account তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বিচ্ছিন্ন পর্যটন সম্ভাবনাগুলোকে একটি পরিকল্পিত ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক শিল্পে রূপ দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য। সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বন, হাওর ও জলাভূমির পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা, ধর্মীয় ঐতিহ্য, গ্রামীণ জীবন, খাবার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও এই পরিকল্পনার আওতায় আসছে।
২০১০ সালের বিদ্যমান পর্যটন নীতির পরিবর্তে জাতীয় পর্যটন নীতি ২০২৬ প্রণয়নের কাজও চলছে। নতুন নীতিতে sustainable tourism-এর পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, Public-Private Partnership (PPP) এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে community-based tourism উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পর্যটন উন্নয়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি পর্যটন গন্তব্যে স্থানীয় মানুষ সরাসরি যুক্ত হলে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, গাইডিং, হস্তশিল্প ও স্থানীয় পণ্য বিক্রির মতো বিভিন্ন খাতে নতুন কর্মসংস্থান ও আয় তৈরির সুযোগ থাকে।
একই সঙ্গে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, একটি গন্তব্যের পরিবেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতি রক্ষা করে পর্যটন পরিচালনা করাও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পরিকল্পনাকে বাস্তব উন্নয়নে রূপ দিতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন (BPC) ইতোমধ্যে ৬০টি উন্নয়ন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যেগুলোর সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা। এসব প্রকল্প বেসরকারি বিনিয়োগ ও PPP-সহ বিভিন্ন অর্থায়ন কাঠামোয় বাস্তবায়নের সুযোগ রাখা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর আওতায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চল, রাজশাহী ও উত্তরাঞ্চল, খুলনা-সুন্দরবন অঞ্চল এবং ঢাকা ও আশপাশের পর্যটন এলাকার অবকাঠামো ও পর্যটন সুবিধা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
হাওর ও eco-tourism, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যটন, সমুদ্রকেন্দ্রিক বা blue tourism, চা-বাগান এবং সাংস্কৃতিক পর্যটনের মতো আলাদা tourism product তৈরির সুযোগও রয়েছে।
বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ হলো সম্ভাবনাময় স্থানকে একটি সম্পূর্ণ tourism product হিসেবে গড়ে তোলা। সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ বা ঐতিহাসিক স্থাপনা থাকলেও সেখানে সহজ যোগাযোগ, মানসম্মত আবাসন, নিরাপদ খাবার ও পানি, স্যানিটেশন, চিকিৎসা সহায়তা, পর্যটক নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলে দেশি-বিদেশি পর্যটক ধরে রাখা কঠিন।
আন্তর্জাতিক পর্যটকের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে বিমান যোগাযোগ, visa facility, digital payment, multilingual information, online booking এবং আন্তর্জাতিক বাজারে destination marketing-এর মতো বিষয়ও যুক্ত হয়।
এ কারণে ১,৪৯৮টি স্থান চিহ্নিত করার পাশাপাশি কোন গন্তব্যে কী ধরনের পর্যটক আকর্ষণ করা হবে এবং স্থানীয় পরিবেশের ওপর চাপ না বাড়িয়ে কতজন পর্যটক ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব—এসব বিষয়ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতের আরেকটি বড় সমস্যা নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্যের ঘাটতি। এ সমস্যা সমাধানে Tourism Satellite Account (TSA) তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যেও ২০২৬ সালে Tourism Satellite Account উন্নয়নের জন্য আলাদা statistical programme-এর কার্যক্রম দেখা যায়।
TSA-এর মাধ্যমে পর্যটকের হোটেল, পরিবহন, খাবার, কেনাকাটা ও বিনোদনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয়ের তথ্য সমন্বয় করে অর্থনীতিতে পর্যটনের প্রত্যক্ষ ও সংশ্লিষ্ট অবদান আরও সুনির্দিষ্টভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হবে।
এই তথ্য ভবিষ্যতে কোথায় বিনিয়োগ প্রয়োজন, কোন পর্যটন পণ্য বেশি সম্ভাবনাময় এবং পর্যটন থেকে কত কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৈরি হচ্ছে—এসব বিষয়ে নীতিনির্ধারণে সহায়তা করতে পারে।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পর্যটক বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিমান যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে কক্সবাজারকে regional tourism hub হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার সঙ্গে নতুন বিমানবন্দর অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগকে যুক্ত করে দেখছে সরকার। পর্যটনমন্ত্রীও জানিয়েছেন, নতুন কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অন্যতম লক্ষ্য বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করা।
তবে নতুন বিমানবন্দর বা পর্যটন অবকাঠামো তৈরি করলেই আন্তর্জাতিক পর্যটক স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে না। প্রতিযোগিতামূলক airfare, সরাসরি আন্তর্জাতিক রুট, সহজ visa process, নিরাপত্তা, পর্যটনসেবার মান এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের destination branding—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে এগোতে হবে।
সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে পর্যটন শুধু বিনোদনকেন্দ্রিক খাত হিসেবে নয়, কর্মসংস্থান, স্থানীয় অর্থনীতি, বেসরকারি বিনিয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি বড় অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে মাস্টারপ্ল্যানের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন, অর্থায়ন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের কার্যকর সমন্বয়ের ওপর।
তথ্যসূত্র: বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS), বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন (BPC) ও সংশ্লিষ্ট প্রকাশিত তথ্য।