
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে বিমানবন্দরগুলো ২০২৫ সালে রেকর্ড ৯৮০ কোটি যাত্রী পরিচালনা করেছে। একই বছর বৈশ্বিক এয়ার কার্গো পরিবহনও সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এয়ারপোর্টস কাউন্সিল ইন্টারন্যাশনাল (ACI) ওয়ার্ল্ডের প্রকাশিত ২০২৬ সালের Annual World Airport Traffic Report–এ বৈশ্বিক বিমান পরিবহন খাতের এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী এয়ার কার্গোর পরিমাণ বেড়ে রেকর্ড ১৩ কোটি ১২ লাখ টনে পৌঁছেছে। একই সময়ে বিমানবন্দরগুলোতে উড়োজাহাজের মোট ওঠানামা বা এয়ারক্রাফট মুভমেন্ট দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ কোটি ৩১ লাখে।
যাত্রী ও কার্গো—দুই ক্ষেত্রেই নতুন রেকর্ড তৈরি হওয়া বৈশ্বিক এভিয়েশন খাতের শক্তিশালী পুনরুদ্ধার ও দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার প্রতিফলন বলে মনে করছে ACI World।
২০২৫ সালে যাত্রী প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে আন্তর্জাতিক বিমান ভ্রমণ থেকে। আগের বছরের তুলনায় আন্তর্জাতিক যাত্রীসংখ্যা ৬ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর বিপরীতে অভ্যন্তরীণ বিমানযাত্রায় প্রবৃদ্ধি ছিল তুলনামূলক কম। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ যাত্রীসংখ্যা বেড়েছে ১ দশমিক ৭ শতাংশ।
এই ব্যবধান থেকে বোঝা যায়, মহামারি-পরবর্তী সময়ে সীমান্তপারের ভ্রমণ, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের চাহিদা বৈশ্বিক যাত্রীবাজারের প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি যাত্রী প্রবৃদ্ধি হয়েছে আফ্রিকায়—৯ শতাংশ।
এরপর মধ্যপ্রাচ্যে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, এশিয়া-প্যাসিফিকে ৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং ইউরোপে ৪ দশমিক ২ শতাংশ যাত্রী প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে।
তবে সব অঞ্চলে একই চিত্র ছিল না। উত্তর আমেরিকায় যাত্রীসংখ্যা ০ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে।
অঞ্চলভেদে এই পার্থক্য আন্তর্জাতিক রুটের সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিমান সংস্থাগুলোর সক্ষমতা এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদার ভিন্নতাকেও তুলে ধরছে।
যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি ২০২৫ সাল বৈশ্বিক এয়ার কার্গোর জন্যও রেকর্ডের বছর ছিল। বিমানবন্দরগুলোর মাধ্যমে মোট ১৩ কোটি ১২ লাখ টন কার্গো পরিবহন হয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্যে দ্রুত ও উচ্চমূল্যের পণ্য পরিবহনে এয়ার কার্গো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ই-কমার্স, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, দ্রুত নষ্ট হওয়ার মতো পণ্য এবং সময়-সংবেদনশীল সরবরাহের ক্ষেত্রে আকাশপথের ওপর নির্ভরতা রয়েছে।
ফলে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি কার্গোর নতুন রেকর্ড বৈশ্বিক বিমানবন্দরগুলোর বাণিজ্য ও লজিস্টিকস ব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান গুরুত্বও তুলে ধরছে।
২০২৫ সালে রেকর্ড যাত্রী পরিবহনের পর ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বৈশ্বিক বিমান ভ্রমণের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়েছে।
বছরের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বের বিমানবন্দরগুলো প্রায় ৪৭০ কোটি যাত্রী পরিচালনা করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি মাত্র ০ দশমিক ৬ শতাংশ।
ACI World-এর মতে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিভিন্ন অঞ্চলের আকাশসীমায় বিঘ্ন এবং অর্থনৈতিক চাপ বিমান ভ্রমণের প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলছে।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান চলাচলে। অঞ্চলটিতে যাত্রী পরিবহন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ শতাংশ কমেছে।
মধ্যপ্রাচ্য বৈশ্বিক বিমান যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট অঞ্চল। ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে বিপুলসংখ্যক দূরপাল্লার ফ্লাইট এই অঞ্চলের প্রধান এভিয়েশন হাবগুলো ব্যবহার করে।
ফলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বা আকাশসীমায় বড় ধরনের বিঘ্ন শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের বিমানবন্দর নয়, আন্তর্জাতিক রুট নেটওয়ার্ক, ফ্লাইট সময়সূচি ও পরিচালন ব্যয়েও প্রভাব ফেলতে পারে।
স্বল্পমেয়াদে অনিশ্চয়তা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক বিমান ভ্রমণের চাহিদা শক্তিশালী থাকবে বলে মনে করছে ACI World।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে জনসংখ্যা ও আয় বৃদ্ধি, নতুন বিমান যোগাযোগ তৈরি, পর্যটনের সম্প্রসারণ এবং মানুষের ভ্রমণচাহিদা ভবিষ্যতে এভিয়েশন খাতের প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে বলে সংস্থাটি মনে করছে।
তবে যাত্রীসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে বিমানবন্দরগুলোর জন্য টার্মিনাল সক্ষমতা, রানওয়ে ও এয়ারসাইড অবকাঠামো, নিরাপত্তা, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এবং প্রযুক্তিনির্ভর যাত্রীসেবা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তাও বাড়বে।
২০২৫ সালের ৯৮০ কোটি যাত্রী এবং রেকর্ড ১৩ কোটি ১২ লাখ টন এয়ার কার্গো তাই শুধু নতুন মাইলফলক নয়; আগামী বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে বিমানবন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
সূত্র: ACI World