
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
বহর আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক রুটে সক্ষমতা বাড়ানোর বড় উদ্যোগ নিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি চলতি বছর দুই দফায় যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা বোয়িংয়ের কাছে মোট ২৫টি নতুন উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৩টি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং ১০টি ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ।
সর্বশেষ গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার ঘোষণা দেয় বিমান ও বোয়িং। এই সম্পূরক ক্রয়াদেশে রয়েছে পাঁচটি ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার এবং ছয়টি ৭৩৭-৮। এর মাধ্যমে ২০২৬ সালে বোয়িংয়ের কাছে বিমানের মোট ক্রয়াদেশ ২৫টিতে পৌঁছেছে।
এর আগে ৩০ এপ্রিল বিমান ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ দেয়, যেটিকে বোয়িং সে সময় বিমানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক উড়োজাহাজ ক্রয়াদেশ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। প্রথম দফার অর্ডারে ছিল আটটি ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭-৮।
দুই দফার ক্রয়াদেশ মিলিয়ে বিমান পাবে মোট ১৫টি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার। এর মধ্যে ১৩টি হবে ৭৮৭-১০ এবং দুটি ৭৮৭-৯। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও স্বল্প থেকে মধ্যপাল্লার রুটের জন্য বহরে যুক্ত হবে ১০টি ৭৩৭-৮।
এখানে দুই ধরনের উড়োজাহাজের ভূমিকা আলাদা। ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার ৭৮৭ পরিবারের সবচেয়ে বড় সংস্করণ এবং বেশি যাত্রীচাহিদার রুটে অতিরিক্ত আসন সক্ষমতা দিতে পারে। অন্যদিকে ৭৮৭-৯ দীর্ঘপাল্লার রুটের জন্য উপযোগী। বোয়িং জানিয়েছে, প্রথম দফায় অর্ডার করা ৭৮৭-৯ উড়োজাহাজগুলো ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দীর্ঘপাল্লার সেবায় সহায়তা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
৭৩৭-৮ হচ্ছে single-aisle বা সরু দেহের উড়োজাহাজ। বিমান এটিকে মধ্যপ্রাচ্য, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক নেটওয়ার্কে ব্যবহার করতে পারবে। নতুন মডেলটি বিমানের বর্তমান Next-Generation 737 বহরের আধুনিকায়নেও ভূমিকা রাখবে।
বিমান ইতোমধ্যে ৭৮৭-৮ ও ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার পরিচালনা করছে। নতুন অর্ডারের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বড় ৭৮৭-১০ সংস্করণও সংস্থাটির বহরে যুক্ত হবে। ফলে ভবিষ্যতে বিমান ৭৮৭ পরিবারের তিনটি সংস্করণই পরিচালনা করতে পারবে।
একই পরিবারের উড়োজাহাজ ব্যবহারের কারণে পাইলট প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ এবং অপারেশনাল ব্যবস্থাপনায় কিছু commonality সুবিধা পাওয়া যায়। বোয়িংও নতুন অর্ডারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৭৮৭ বহরের সঙ্গে এই operational commonality-কে একটি সুবিধা হিসেবে তুলে ধরেছে।
তবে ৭৮৭-১০-এর বড় যাত্রী ধারণক্ষমতার সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে এমন রুট প্রয়োজন যেখানে নিয়মিত পর্যাপ্ত যাত্রীচাহিদা রয়েছে। অর্থাৎ শুধু নতুন উড়োজাহাজ কেনাই নয়, কোন রুটে কোন মডেল ব্যবহার করা হবে—সেটিও বিমানের ভবিষ্যৎ বহর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আধুনিক উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে জ্বালানি দক্ষতা এয়ারলাইনসগুলোর অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয়। বোয়িংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও ৭৩৭ ম্যাক্স পরিবার যেসব পুরোনো প্রজন্মের উড়োজাহাজ প্রতিস্থাপন করে, সেগুলোর তুলনায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা উন্নত করতে পারে।
এয়ারলাইন পরিচালনায় জ্বালানি বড় ব্যয়ের একটি অংশ। ফলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি-দক্ষ বহর পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নতুন আন্তর্জাতিক রুটের অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরিতেও সহায়ক হতে পারে। তবে প্রকৃত সাশ্রয় রুটের দূরত্ব, যাত্রী ও কার্গো লোড, উড়োজাহাজের কনফিগারেশন এবং পরিচালন পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
২৫টি উড়োজাহাজের বড় অর্ডার বিমানের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করবে, তবে উড়োজাহাজ হাতে পেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন রুট চালু হবে—বিষয়টি এমন নয়।
নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর আগে যাত্রীচাহিদা, bilateral air service agreement, airport slot, crew availability, ground handling, route profitability এবং সংশ্লিষ্ট দেশের regulatory approvalসহ একাধিক বিষয় বিবেচনা করতে হয়।
বর্তমানে বিমান মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করছে। বোয়িংয়ের এপ্রিলের ঘোষণার সময় সংস্থাটি ঢাকা থেকে ২২টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনার কথা জানিয়েছিল।
বিমানের চেয়ারম্যান রুমী এ হোসেন বলেছেন, সম্পূরক চুক্তিটি সংস্থার চলমান বহর নবায়ন ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের মানুষ, প্রবাসী বাংলাদেশি, ব্যবসা ও পর্যটনের ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক সংযোগ শক্তিশালী করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বেশি যাত্রীচাহিদার রুটে আসনসংখ্যা বাড়ানো, আঞ্চলিক গন্তব্যে ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ানো এবং উপযুক্ত বাজারে নতুন রুট চালুর সুযোগ তৈরি হতে পারে। যাত্রীদের জন্য এর বাস্তব সুবিধা অবশ্য নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কোন উড়োজাহাজ কোন রুটে মোতায়েন করা হচ্ছে এবং ফ্লাইট সূচি কীভাবে সাজানো হচ্ছে তার ওপর।
বড় উড়োজাহাজ ক্রয়াদেশের ক্ষেত্রে অর্ডার এবং ডেলিভারি এক বিষয় নয়। উড়োজাহাজগুলো উৎপাদন ও সরবরাহসূচি অনুযায়ী ধাপে ধাপে বহরে যুক্ত হবে।
বিশেষ করে সর্বশেষ ১১টি উড়োজাহাজের ঘোষণায় বোয়িং ক্রয়মূল্য, অর্থায়নের বিস্তারিত শর্ত বা প্রতিটি উড়োজাহাজের নির্দিষ্ট সরবরাহের তারিখ প্রকাশ করেনি। তাই ২৫টি উড়োজাহাজ কবে নাগাদ সম্পূর্ণভাবে বিমানের বহরে যুক্ত হবে, সেটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক সময়সূচির বাইরে অনুমান করা ঠিক হবে না।
১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বিভিন্ন সময়ে বোয়িংয়ের একাধিক প্রজন্মের উড়োজাহাজ পরিচালনা করেছে। বর্তমানে সংস্থাটির বোয়িং বহরে ৭৮৭, ৭৭৭ এবং Next-Generation 737 রয়েছে। নতুন ৭৮৭ ও ৭৩৭-৮ যুক্ত হলে বহরের গঠন উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যাবে।
২৫টি নতুন উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ তাই শুধু বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয় নয়। এগুলো সময়মতো সরবরাহ, সঠিক রুট পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত যাত্রী ও কার্গো চাহিদা, দক্ষ জনবল এবং কার্যকর বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বয় করা গেলে বিমানের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখতে পারে।
তথ্যসূত্র: Boeing, Biman Bangladesh Airlines — ৩০ এপ্রিল ও ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।