
টানা ভারী বৃষ্টি, দমকা হাওয়া ও উত্তাল সমুদ্রের কারণে দেশের প্রধান দুই সমুদ্র পর্যটন গন্তব্য কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় পর্যটক উপস্থিতি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। বঙ্গোপসাগরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেতের মধ্যে পর্যটকদের অনেকেই আগাম হোটেল বুকিং বাতিল করেছেন। যারা ইতোমধ্যে গন্তব্যে পৌঁছেছেন, তাদেরও বড় অংশ হোটেলেই সময় কাটাচ্ছেন।
পর্যটন ব্যবসায়ীদের দাবি, মাত্র চার থেকে পাঁচ দিনের প্রতিকূল আবহাওয়ায় কক্সবাজারে প্রায় ৫০ হাজার পর্যটকের আগাম বুকিং বাতিল হয়েছে। পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায় এর প্রভাব পড়েছে। ব্যবসায়ীদের প্রাথমিক হিসাবে কক্সবাজারের পর্যটন অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে কুয়াকাটায় সাপ্তাহিক ছুটির সময়ও হোটেল-মোটেলের কক্ষ দখলের হার নেমে এসেছে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশে।
কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়েক দিনের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার পর্যটকের আগাম বুকিং বাতিল হয়েছে।
এতে শুধু হোটেল-রিসোর্ট নয়, পুরো পর্যটন সরবরাহ ব্যবস্থাতেই প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
তাদের হিসাবে, পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসায় সম্মিলিতভাবে প্রায় ১০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
তবে এই ১০০ কোটি টাকা ব্যবসায়ীদের দেওয়া প্রাথমিক হিসাব। সরকারি কোনো পূর্ণাঙ্গ আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের তথ্য হিসেবে এটিকে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
বৈরী আবহাওয়ার প্রভাব শুধু সৈকতে সীমাবদ্ধ নেই। কক্সবাজারে পর্যটক যাতায়াতেও সমস্যা তৈরি হয়েছে।
মুকিম খানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কক্সবাজার-ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় অনেক পর্যটকের পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা ও যানজটের কারণে বাস চলাচলেও বিঘ্ন ঘটেছে।
বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাদের অনেকেই স্বাভাবিকভাবে সৈকতে সময় কাটাতে পারছেন না। কেউ কেউ নির্ধারিত সময়ের আগেই কক্সবাজার ছাড়ছেন।
পর্যটনের ক্ষেত্রে গন্তব্য আকর্ষণীয় হওয়ার পাশাপাশি সেখানে পৌঁছানোর নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। সড়ক বা রেল যোগাযোগে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে হোটেল বুকিং থেকে স্থানীয় পরিবহন—পুরো পর্যটন অর্থনীতিতেই তার প্রভাব পড়ে।
কক্সবাজারের জনপ্রিয় লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী সৈকতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় পর্যটকের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সৈকতকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়।
বিচ বাইক, চেয়ার-ছাতা ভাড়া, ফটোগ্রাফি, খাবারের দোকান এবং পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
পর্যটন অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে—একজন পর্যটকের ব্যয় শুধু হোটেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার পরিবহন, খাবার, কেনাকাটা, বিনোদন ও স্থানীয় সেবায় করা ব্যয় অনেক মানুষের আয়ের উৎস তৈরি করে।
তাই হঠাৎ পর্যটক কমে গেলে বড় হোটেলের পাশাপাশি দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও শ্রমজীবী মানুষ তুলনামূলক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হন।
কক্সবাজারের মতো একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত।
সাপ্তাহিক ছুটিতে যেখানে হোটেল-মোটেলে পর্যটকের ব্যস্ততা থাকার কথা, সেখানে কক্ষ দখলের হার নেমে এসেছে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশে।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ আগাম বুকিং বাতিল হয়েছে।
এর প্রভাব হোটেলের বাইরে রেস্তোরাঁ, ট্যুর অপারেটর, ট্যুর গাইড, অটোরিকশা চালক, স্থানীয় ফটোগ্রাফার এবং সৈকতসংলগ্ন ছোট ব্যবসায়ীদের ওপরও পড়েছে।
কক্সবাজার ও কুয়াকাটার বর্তমান পরিস্থিতি দেশের উপকূলীয় পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও সামনে এনেছে।
এই দুই গন্তব্যের পর্যটন ব্যবসার বড় অংশ সৈকত ও অনুকূল আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। ফলে কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি বা উত্তাল সমুদ্রও পর্যটকের ভ্রমণ পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
এই ঝুঁকি কমাতে সৈকতকেন্দ্রিক কার্যক্রমের পাশাপাশি ইনডোর বিনোদন, স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাবারভিত্তিক পর্যটন, জাদুঘর, হস্তশিল্প কেন্দ্র এবং আবহাওয়ানির্ভর নয়—এমন বিকল্প পর্যটন অভিজ্ঞতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
এতে প্রতিকূল আবহাওয়ার সময়ও পর্যটকদের গন্তব্যে ধরে রাখা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
বঙ্গোপসাগরে বৈরী পরিস্থিতিতে সমুদ্রবন্দরগুলোকে স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হলে পর্যটকদেরও বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
সমুদ্র বাইরে থেকে তুলনামূলক শান্ত মনে হলেও ঢেউ, জোয়ার এবং পানির নিচের স্রোতের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।
বিশেষ করে লাল নিশানা দেওয়া এলাকা, লাইফগার্ডের নিষেধাজ্ঞা কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের সতর্কতা উপেক্ষা করে পানিতে নামা উচিত নয়।
সৈকতে ভ্রমণের সময় শিশুদের একা পানিতে না নামানো, প্রতিকূল আবহাওয়ায় গভীর পানিতে না যাওয়া এবং স্থানীয় প্রশাসন ও লাইফগার্ডের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে কক্সবাজার বা কুয়াকাটা ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে শুধু হোটেল বুকিং নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়।
রওনা হওয়ার আগে আবহাওয়ার সর্বশেষ পূর্বাভাস, সড়ক ও রেল যোগাযোগের অবস্থা এবং স্থানীয় প্রশাসনের পর্যটন ও সমুদ্রসৈকত-সংক্রান্ত নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।
হোটেল বা ট্যুর প্যাকেজ আগে থেকে বুক করা থাকলে তার cancellation, rescheduling এবং refund policy-ও জেনে রাখা ভালো। বিশেষ করে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পরিবহন বাতিল হলে হোটেলের বুকিং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরতযোগ্য হবে—এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আশা, আবহাওয়ার উন্নতি হলে কক্সবাজার ও কুয়াকাটায় আবার পর্যটক বাড়তে শুরু করবেন।
তবে কয়েক দিনের প্রতিকূল আবহাওয়ায় হাজার হাজার বুকিং বাতিল এবং পর্যটন ব্যবসায় বড় অঙ্কের ক্ষতির দাবি দেখাচ্ছে, বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্র পর্যটন গন্তব্যগুলো এখনও আবহাওয়াজনিত ঝুঁকির প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
দীর্ঘমেয়াদে এই ঝুঁকি মোকাবিলায় নিরাপদ পর্যটন ব্যবস্থাপনা, নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ, দ্রুত আবহাওয়া তথ্য, সহজ বুকিং পরিবর্তন ব্যবস্থা এবং সৈকতের বাইরে বিকল্প পর্যটন পণ্য তৈরি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আর পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভ্রমণ আনন্দের হলেও সমুদ্র ও আবহাওয়ার সতর্কতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
সূত্র: কক্সবাজার ও কুয়াকাটার হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসায়ী, স্থানীয় প্রশাসন ও আবহাওয়া-সংশ্লিষ্ট তথ্য