
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
বহর আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা বোয়িং- এর কাছ থেকে আরও ১১টি নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের চুক্তি করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। নতুন ক্রয়াদেশে রয়েছে পাঁচটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার এবং ছয়টি ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রুমী এ হোসেন এবং বোয়িংয়ের কমার্শিয়াল সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্র্যাড ম্যাকমুলেন নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্পূরক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ূন কবির, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউসহ দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নতুন ১১টি উড়োজাহাজের চুক্তিটি আলাদাভাবে দেখলে বড় হলেও এটি বিমানের আরও বড় বহর পরিকল্পনার অংশ। এর আগে ২০২৬ সালে বিমান ১৪টি ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজের অর্ডার দিয়েছিল। নতুন ১১টি যুক্ত হওয়ায় চলতি বছরে বোয়িংয়ের কাছে বিমানের মোট অর্ডার দাঁড়িয়েছে ২৫টি উড়োজাহাজে।
বিমানের চেয়ারম্যান রুমী এ হোসেন বলেছেন, সম্পূরক চুক্তিটি সংস্থাটির চলমান বহর নবায়ন ও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। বহরের নির্দিষ্ট প্রয়োজন বিবেচনায় এই অর্ডার দেওয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশের মানুষ, প্রবাসী জনগোষ্ঠী, ব্যবসা ও পর্যটনের ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন অর্ডারে থাকা দুই ধরনের উড়োজাহাজ বিমানের নেটওয়ার্কে ভিন্ন ভূমিকা রাখতে পারে। ৭৮৭-১০ একটি wide-body বা প্রশস্ত দেহের উড়োজাহাজ। বোয়িং বলছে, এটি বিমানের বিদ্যমান ৭৮৭-৮ ও ৭৮৭-৯-এর তুলনায় বেশি যাত্রী ধারণক্ষমতা যোগ করবে। ফলে উচ্চ যাত্রীচাহিদার আন্তর্জাতিক রুটে অতিরিক্ত আসন সক্ষমতা তৈরির সুযোগ থাকবে।
অন্যদিকে ৭৩৭-৮ হচ্ছে single-aisle উড়োজাহাজ। এর মাধ্যমে বিমানের আঞ্চলিক নেটওয়ার্কে বর্তমান ৭৩৭ প্রজন্মের তুলনায় বেশি range বা দূরত্বে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে বলে জানিয়েছে বোয়িং।
বর্তমানে বিমানের বহরে ৭৮৭-৮, ৭৮৭-৯, ৭৭৭-৩০০ইআর, ৭৩৭ এবং ড্যাশ ৮-৪০০ রয়েছে। বিমানের প্রকাশিত fleet information অনুযায়ী বর্তমানে চারটি ৭৮৭-৮ এবং দুটি ৭৮৭-৯ রয়েছে।
বিমানের বিদ্যমান বহরে আগে থেকেই বোয়িং ৭৮৭ ও ৭৩৭ পরিবারের উড়োজাহাজ রয়েছে। ফলে নতুন মডেলগুলো যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে fleet commonality একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হতে পারে। বোয়িংও নতুন অর্ডারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বহরের সঙ্গে operational commonality-এর বিষয়টি তুলে ধরেছে।
একই aircraft family-এর বিভিন্ন সংস্করণ পরিচালনা করলে প্রশিক্ষণ, অপারেশন, রক্ষণাবেক্ষণ ও বহর ব্যবস্থাপনার কিছু ক্ষেত্রে সমন্বয়ের সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। তবে বাস্তব পরিচালন ব্যয় নির্ভর করবে কনফিগারেশন, ইঞ্জিন, রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি, যন্ত্রাংশ ব্যবস্থাপনা এবং উড়োজাহাজ ব্যবহারের ধরনের ওপর।
আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন ব্যবসায় জ্বালানি পরিচালন ব্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বোয়িংয়ের দাবি অনুযায়ী, ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও ৭৩৭ ম্যাক্স পরিবার যেসব পুরোনো প্রজন্মের উড়োজাহাজ প্রতিস্থাপন করে, সেগুলোর তুলনায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি জ্বালানি দক্ষতা দিতে পারে।
বিমানের ক্ষেত্রে আধুনিক উড়োজাহাজের এই দক্ষতা দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক রুটে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। তবে কোনো এয়ারলাইনের প্রকৃত জ্বালানি সাশ্রয় রুট, যাত্রী ও কার্গো লোড, আবহাওয়া, উড়োজাহাজের কনফিগারেশন এবং অপারেশনাল ব্যবস্থাপনার ওপরও নির্ভর করে।
বিমানের বর্তমান আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যগুলোকে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করছে। নতুন উড়োজাহাজ ধাপে ধাপে বহরে এলে বেশি যাত্রীচাহিদার রুটে আসন সক্ষমতা বাড়ানো, উপযুক্ত রুটে ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি বৃদ্ধি এবং নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্য বিবেচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে উড়োজাহাজের অর্ডার মানেই সঙ্গে সঙ্গে নতুন রুট বা অতিরিক্ত ফ্লাইট নয়। নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু করতে যাত্রীচাহিদা, দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল চুক্তি, বিমানবন্দর স্লট, ক্রু ও উড়োজাহাজের প্রাপ্যতা, পরিচালন ব্যয় এবং বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করতে হয়।
যাত্রীদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—১১টি উড়োজাহাজের চুক্তি সম্পন্ন হওয়া মানে এগুলো এখনই বিমানের বহরে যুক্ত হচ্ছে না। বড় বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে অর্ডারের পর উৎপাদন, গ্রাহকভিত্তিক কনফিগারেশন, পরীক্ষা ও ডেলিভারির দীর্ঘ প্রক্রিয়া থাকে।
বোয়িংয়ের ২৩ সেপ্টেম্বরের ঘোষণায় নতুন ১১টি উড়োজাহাজের পৃথক মূল্য, অর্থায়নের বিস্তারিত শর্ত কিংবা প্রতিটি উড়োজাহাজের নির্দিষ্ট ডেলিভারি সময় প্রকাশ করা হয়নি।
ফলে নতুন উড়োজাহাজগুলো কোন বছর থেকে বহরে আসবে এবং কোন কোন রুটে মোতায়েন করা হবে—এ বিষয়ে বিমান বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুসরণ করাই যুক্তিযুক্ত।
নতুন এই অর্ডার তাই শুধু বিমানের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নয়; এটি জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির দীর্ঘমেয়াদি বহর কাঠামো পরিবর্তনের অংশ। উড়োজাহাজগুলো সময়মতো সরবরাহ, যথাযথ রুট পরিকল্পনা এবং কার্যকর বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তথ্যসূত্র: Boeing-এর ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং Biman Bangladesh Airlines-এর প্রকাশিত fleet information।