
ইরানের বিমান পরিবহন খাতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে পড়তে শুরু করেছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর বাগদাদ ও মাসকাটসহ কয়েকটি গন্তব্যে ইরানি এয়ারলাইনসের ফ্লাইট বন্ধ বা বাতিল হয়েছে। জর্জিয়া ও আজারবাইজানও ইরানি এয়ারলাইনসের ফ্লাইট স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে চীনসহ কয়েকটি গন্তব্যে এখনো ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট নতুন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ইরানি এয়ারলাইনসকে সেবা দেওয়া বিদেশি বিমানবন্দর ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি এয়ারলাইনসকে জ্বালানি, ল্যান্ডিং সেবা বা টিকিট বিক্রির মতো সহায়তা দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার মুখপাত্র মাজিদ আখাভান জানিয়েছেন, বাগদাদ ও মাসকাট বিমানবন্দর ইরানি ফ্লাইট গ্রহণ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তেহরান থেকে দুই গন্তব্যের ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে। বাগদাদগামী ফ্লাইট নাজাফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্থানান্তরের বিষয়েও আলোচনা হয়।
ইরাকের পক্ষ থেকেও বাগদাদে ইরানি ফ্লাইট স্থগিতের নির্দেশ দেওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে রয়টার্স। অন্যদিকে জর্জিয়া ও আজারবাইজান ইরানি এয়ারলাইনসের ফ্লাইট স্থগিত করেছে। তেহরানের একটি ট্রাভেল এজেন্সির বরাতে কাতারগামী ফ্লাইটও বন্ধ হওয়ার তথ্য এসেছে।
তবে নিষেধাজ্ঞার অর্থ এই নয় যে ইরানের সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইট একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পরও মাহান এয়ারের একটি ফ্লাইট তেহরান থেকে চীনের গুয়াংজুতে পৌঁছেছে বলে FlightRadar24-এর তথ্য উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। চীন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে আসছে।
ইরানের বিমান পরিবহন খাত দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। এবারের ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, চাপ শুধু ইরানি এয়ারলাইনসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না; তাদের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম সচল রাখতে প্রয়োজনীয় বিদেশি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানকেও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির মুখে ফেলা হচ্ছে।
একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য শুধু গন্তব্য দেশের আকাশসীমায় প্রবেশের অনুমতিই যথেষ্ট নয়। বিমানবন্দরে অবতরণের পর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, জ্বালানি, যাত্রী ও ব্যাগেজ সেবা এবং অন্যান্য পরিচালন সহায়তা প্রয়োজন হয়। এসব সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়লে কোনো রুটে উড়োজাহাজ পরিচালনা কার্যত জটিল হয়ে যেতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নিজে থেকেই অন্য দেশের আকাশসীমা বা বিমানবন্দর বন্ধ করে দেয় না। এর বাস্তব প্রভাব নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট সরকার, বিমানবন্দর ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয় তার ওপর। এ কারণেই কিছু রুট বন্ধ হলেও অন্য কয়েকটি গন্তব্যে ইরানি ফ্লাইট অব্যাহত রয়েছে।
পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে যাত্রীদের ওপর। আন্তর্জাতিক রুট হঠাৎ স্থগিত হলে আগে থেকে টিকিট কাটা যাত্রীদের বিকল্প ফ্লাইট খুঁজতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ ফ্লাইট পরিচালিত হবে কি না—এমন অনিশ্চয়তা নতুন বুকিংয়েও প্রভাব ফেলছে।
বিশেষ করে ইরাকের নাজাফ ইরানি তীর্থযাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। বাগদাদের পরিবর্তে সেখানে ফ্লাইট পরিচালনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হলেও পরবর্তী সময়ে ইরাকের আরও কয়েকটি বিমানবন্দরে ইরানি ফ্লাইটে বিধিনিষেধ আরোপের খবর এসেছে। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ আরও সীমিত হলে যাত্রীদের সংযোগ ফ্লাইট বা স্থলপথের মতো বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। এতে ভ্রমণের সময় ও ব্যয়—দুটিই বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে কতগুলো দেশ ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে ইরানি এয়ারলাইনসকে সেবা সীমিত করে। কারণ সেটিই নির্ধারণ করবে বর্তমান পরিস্থিতি কয়েকটি রুটের সাময়িক বিঘ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ইরানের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ আরও সংকুচিত হবে।
তথ্যসূত্র: Reuters, AFP, Iran Civil Aviation Organization এবং FlightRadar24-এর তথ্যভিত্তিক প্রকাশিত প্রতিবেদন।