
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও জাপানি পক্ষের আলোচনা এগোলেও এখনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি। আলোচনায় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব, টার্মিনালের আয় বণ্টন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আর্থিক দায় ও অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
এর পাশাপাশি performance security, liability freeze, সরকারের সম্ভাব্য comfort letter এবং আর্থিক কাঠামোর আরও কিছু বিষয় নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে এসব আলোচনা চলমান থাকা সত্ত্বেও আগামী ১৬ ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে সীমিত পরিসরে তৃতীয় টার্মিনাল চালুর লক্ষ্য সামনে রেখেই প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে সরকার ও বেবিচক। সাম্প্রতিক সরকারি বক্তব্যেও ১৬ ডিসেম্বর আংশিক কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
তৃতীয় টার্মিনালের Operation and Maintenance (O&M) পরিচালনার জন্য জাপানি পক্ষ গত ২৫ আগস্ট তাদের technical ও financial proposal বেবিচকের কাছে জমা দেয়। এরপর সেগুলো মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট RFP Evaluation Committee-তে পাঠানো হয়।
পরবর্তীতে ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক contract negotiation শুরু হয়। প্রথম দফার আলোচনায় উঠে আসা প্রস্তাব ও শর্তগুলো সংশ্লিষ্ট পক্ষ পর্যালোচনা করছে। সমাধান না হওয়া বিষয়গুলো পরবর্তী আলোচনায় আবারও সামনে আসতে পারে।
এই আলোচনার গুরুত্ব অনেক। কারণ তৃতীয় টার্মিনালের ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হওয়া এবং সেটি বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার জন্য পূর্ণাঙ্গ O&M framework তৈরি করা এক বিষয় নয়। কে কোন সেবা দেবে, আয় কীভাবে ভাগ হবে, operational risk কার ওপর থাকবে এবং বিভিন্ন পক্ষের আর্থিক দায় কীভাবে নিষ্পত্তি হবে—এসব বিষয় চুক্তিতে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ground handling। বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তৃতীয় টার্মিনালে দ্বিতীয় ground handler নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে। বেবিচক আগেই জানিয়েছে, প্রতিযোগিতা সৃষ্টি ও সেবার মান বাড়াতে বিমানের পাশাপাশি দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠানকে ground handling-এর সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার প্রস্তাব করেছে বিমানকে ground-handling কার্যক্রমের ৫০ শতাংশ রাখার সুযোগ দেওয়া হোক। তবে দায়িত্বের চূড়ান্ত বণ্টন এখনও আলোচনাধীন।
Ground handling শুধু যাত্রীর লাগেজ ওঠানো-নামানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। Aircraft turnaround, baggage handling, ramp services এবং বিভিন্ন ground-support operation একটি এয়ারলাইন্সের সময়ানুবর্তিতা ও যাত্রীসেবার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
ফলে কে কত শতাংশ কাজ পাবে—তার পাশাপাশি service standard, manpower, equipment, turnaround target এবং performance monitoring-ও গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয় টার্মিনাল থেকে অর্জিত revenue কীভাবে ভাগ হবে, সেটিও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার অন্যতম বিষয়।
সেপ্টেম্বরে বিমানমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগের কাঠামোয় বাংলাদেশের জন্য ১৫ শতাংশ revenue share থাকার কথা থাকলেও নতুন আলোচনায় সেটি ২৭ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব এসেছে।
তবে revenue sharing-কে শুধু একটি শতাংশ দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। কোন কোন revenue stream এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হবে, operation ও maintenance-এর ব্যয় কে বহন করবে এবং বিনিয়োগ ও ঝুঁকি কীভাবে ভাগ হবে—চুক্তির প্রকৃত আর্থিক মূল্যায়নে এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণেই revenue sharing-এর পাশাপাশি ground handling এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক দায়ের বিষয়গুলো একই আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
চুক্তি আলোচনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বিমানের নিজস্ব আর্থিক দায় নতুন ব্যবস্থায় অন্য কোনো পক্ষের ওপর সরাসরি স্থানান্তর না করে বিমানকেই বহন করতে হবে—এমন কাঠামো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
অর্থ পরিশোধের ঝুঁকি কমাতে performance security রাখার প্রস্তাবও রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে পাওনা পরিশোধ না হলে নিরাপত্তা জামানত থেকে অর্থ সমন্বয়ের মতো ব্যবস্থা রাখা যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
একই সঙ্গে সরাসরি sovereign বা government guarantee-এর পরিবর্তে সরকারের পক্ষ থেকে একটি comfort letter দেওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।
এখানে comfort letter এবং government guarantee-এর মধ্যে পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে comfort letter কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়ের বিপরীতে পূর্ণাঙ্গ sovereign guarantee-এর সমতুল্য নাও হতে পারে। এর প্রকৃত আইনি ও আর্থিক গুরুত্ব নির্ভর করবে চূড়ান্ত নথিতে কী ধরনের প্রতিশ্রুতি ও বাধ্যবাধকতা রাখা হচ্ছে তার ওপর।
আলোচনায় আরেকটি technical বিষয় হচ্ছে liability freeze। এর সময়সীমা এবং কোন পর্যায়ের আর্থিক দায় এর আওতায় থাকবে—সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তৃতীয় টার্মিনালের নতুন operational structure কার্যকর হওয়ার আগে সৃষ্ট দায় এবং নতুন ব্যবস্থার অধীনে তৈরি হওয়া দায়ের হিসাব কোথায় আলাদা হবে, সেটি স্পষ্ট করা গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে পরবর্তী সময়ে কোন পক্ষ কোন অর্থ পরিশোধ করবে—এ নিয়ে বিরোধের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
Performance security, comfort letter ও liability freeze-সংক্রান্ত এসব বিষয় এখনো আলোচনাধীন প্রস্তাব। তাই চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার আগে এগুলোকে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
চুক্তি আলোচনা শেষ না হলেও সরকার আপাতত ১৬ ডিসেম্বর আংশিকভাবে তৃতীয় টার্মিনাল চালু করার লক্ষ্য ধরে রেখেছে।
বিমানমন্ত্রী জানিয়েছেন, শুরুতে নতুন টার্মিনাল থেকে প্রায় ২০টি ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর operational readiness বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যায়ক্রমে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো হবে। পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম আগামী বছরের মার্চ বা এপ্রিল নাগাদ শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। The Daily Star
অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বরকে তৃতীয় টার্মিনালের পূর্ণ সক্ষমতায় commercial operation শুরুর তারিখ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী এটি হবে সীমিত বা আংশিক কার্যক্রমের সূচনা।
এটি যাত্রীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুরুতে সব আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন বা সব ফ্লাইট একযোগে নতুন টার্মিনালে স্থানান্তরিত নাও হতে পারে।
চুক্তির পাশাপাশি তৃতীয় টার্মিনাল চালুর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো Operational Readiness and Airport Transfer (ORAT)।
ORAT-এর মাধ্যমে বাস্তব যাত্রীসেবা শুরুর আগে check-in, baggage handling, immigration, customs, security screening, boarding, IT systems, emergency response, ground handling এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম পরীক্ষা করা হয়।
জুলাইয়ে সরকার জানিয়েছিল, ১৬ ডিসেম্বরের লক্ষ্য অর্জনের জন্য ORAT প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া জরুরি।
তাই একটি O&M agreement স্বাক্ষর হলেই পরদিন থেকে পুরো টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা সম্ভব—বিষয়টি এমন নয়। চুক্তির পাশাপাশি system integration, manpower training, equipment testing এবং operational trial-ও গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয় টার্মিনাল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিমানবন্দর অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি। কিন্তু আধুনিক ভবন বা নতুন যন্ত্রপাতির পাশাপাশি এর সাফল্যের বড় মাপকাঠি হবে বাস্তব passenger experience।
Check-in ও immigration-এ অপেক্ষার সময়, baggage delivery, aircraft turnaround, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, security processing, transfer passenger management এবং flight information—এসব সেবার মানই শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের কাছে নতুন টার্মিনালের কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।
সরকার জানিয়েছে, ground-handling service-এর মান পর্যবেক্ষণে Key Performance Indicators (KPI) ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
ফলে চলমান আলোচনা শুধু একটি বাণিজ্যিক চুক্তির বিষয় নয়। Ground handling থেকে revenue sharing এবং আর্থিক দায়ের নিশ্চয়তা—চূড়ান্ত কাঠামো ভবিষ্যতে দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সেবা ও পরিচালনার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।
বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আলোচনাধীন শর্তগুলো দ্রুত কিন্তু যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করা এবং একই সঙ্গে operational readiness নিশ্চিত করা। ১৬ ডিসেম্বর সীমিত পরিসরে কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্য থাকলেও চূড়ান্ত সময়সূচি বাস্তবায়ন নির্ভর করবে চুক্তি, ORAT এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রস্তুতির ওপর।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।