
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ এবং বিদেশ ভ্রমণে যাত্রী চাহিদা পুনরুদ্ধারের ফলে বৈশ্বিক বিমান সংযোগ সক্ষমতার তালিকায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে চীনের প্রধান বিমানবন্দরগুলো। এভিয়েশন ডাটা ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান OAG-এর ২০২৬ সালের Megahubs Index অনুযায়ী, গুয়াংঝো বাইয়ুন, সাংহাই পুডং ও বেইজিং ক্যাপিটালসহ চীনের গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরগুলোর আন্তর্জাতিক কানেক্টিভিটিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
এবারের তালিকায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত বিমানবন্দর হিসেবে শীর্ষে উঠে এসেছে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর (IST)। গত বছরের শীর্ষে থাকা লন্ডন হিথ্রো (LHR) নেমে এসেছে দ্বিতীয় স্থানে। তৃতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে আমস্টারডাম শিফল বিমানবন্দর (AMS)।
চীনের বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে গুয়াংঝো বাইয়ুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (CAN)। নতুন টার্মিনাল-৩ চালুর পর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের সঙ্গে বিমানবন্দরটির বৈশ্বিক মেগাহাব অবস্থান ১৭ ধাপ উন্নত হয়েছে।
২০২৬ সালের শুরু থেকেই গুয়াংঝোতে যাত্রী ও ফ্লাইট কার্যক্রম বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। বর্তমানে প্রায় ৮০টি এয়ারলাইনসের মাধ্যমে ১৪৬টি আন্তর্জাতিক রুটের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিমানবন্দরটি।
চীনের অন্যতম বৃহৎ এয়ারলাইন China Southern Airlines-এর প্রধান হাব হওয়ায় গুয়াংঝো অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক যাত্রীদের মধ্যে সংযোগ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষ করে বিশাল অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক থেকে যাত্রী এনে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ বিমানবন্দরটির হাব সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করছে।
সাংহাই পুডং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (PVG)-এর অবস্থানও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। বিমানবন্দরটি আগের ১৯তম স্থান থেকে পাঁচ ধাপ এগিয়ে ১৪তম স্থানে উঠে এসেছে।
সাংহাই চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া-প্যাসিফিক এবং অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে এর আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী।
মহামারির পর আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পুনরুদ্ধারের সঙ্গে নতুন ও পুনরায় চালু হওয়া রুটগুলো পুডংয়ের কানেক্টিভিটি বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
চীনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ গেটওয়ে বেইজিং ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (PEK) ১০ ধাপ এগিয়ে ৪৪তম অবস্থানে এসেছে।
বেইজিংয়ে নতুন Daxing International Airport চালুর পর রাজধানীর বিমান চলাচল দুটি বড় বিমানবন্দরের মধ্যে ভাগ হয়ে গেলেও Beijing Capital এখনো আন্তর্জাতিক রুটের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
অন্যদিকে হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (HKG) দুই ধাপ এগিয়ে বিশ্বের ২০তম সবচেয়ে সংযুক্ত আন্তর্জাতিক মেগাহাব হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
OAG-এর Megahubs Index শুধু কোনো বিমানবন্দরে কত যাত্রী চলাচল করে বা কতটি গন্তব্যে ফ্লাইট রয়েছে—তার ভিত্তিতে তৈরি করা হয় না।
র্যাঙ্কিংয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিমানবন্দরটির নির্ধারিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট থেকে যাত্রীরা বাস্তবে কতগুলো সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক সংযোগ তৈরি করতে পারেন, সেটি বিশ্লেষণ করা হয়।
সহজভাবে বলতে গেলে, কোনো বিমানবন্দরে শুধু বেশি ফ্লাইট থাকলেই সেটি বড় মেগাহাব হবে না। ফ্লাইটগুলোর সময়সূচি এমনভাবে সাজানো থাকতে হবে, যাতে একটি ফ্লাইটে আসা যাত্রী যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে অন্য আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে সংযোগ নিতে পারেন।
এ কারণেই কোনো বিমানবন্দরের যাত্রীসংখ্যা বিশ্বের সর্বোচ্চ না হলেও দক্ষ কানেক্টিং নেটওয়ার্ক থাকলে OAG Megahubs তালিকায় সেটি অনেক ওপরে থাকতে পারে।
২০২৬ সালের তালিকায় ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের প্রথম অবস্থানে উঠে আসা বৈশ্বিক বিমান পরিবহন ব্যবস্থায় তুরস্কের ক্রমবর্ধমান হাব ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
ইস্তাম্বুলের ভৌগোলিক অবস্থান ইউরোপ, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার মধ্যে স্বাভাবিক সংযোগস্থল তৈরি করেছে। এর সঙ্গে Turkish Airlines-এর বিস্তৃত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক যুক্ত হওয়ায় বিপুলসংখ্যক connecting itinerary তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
অন্যদিকে দীর্ঘদিন বিশ্বের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক হাব হিসেবে থাকা লন্ডন হিথ্রো এবার দ্বিতীয় এবং আমস্টারডাম শিফল তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।
OAG-এর প্রধান বিশ্লেষক জন গ্রান্টের মতে, কোভিড-১৯ মহামারির পর চীনের বিমান পরিবহন বাজার প্রথমে অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক পুনরুদ্ধারের দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছিল।
কিন্তু গত দুই বছরে পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন শহরে নতুন ও পুনরায় চালু হওয়া ফ্লাইটের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ামুখী সক্ষমতাও বেড়েছে।
ফলে আন্তর্জাতিক রুটের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে চীনের বড় বিমানবন্দরগুলোতে সম্ভাব্য connecting flight-এর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে।
একটি নতুন আন্তর্জাতিক রুট শুধু নতুন একটি শহরের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে না; সেই রুট যদি বিমানবন্দরের বিদ্যমান নেটওয়ার্কের বহু ফ্লাইটের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত হয়, তাহলে শত শত নতুন সম্ভাব্য connecting itinerary তৈরি হতে পারে। এ কারণেই নতুন রুট একটি বিমানবন্দরের Megahub ranking-এ তুলনামূলক বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
চীনের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের পেছনে শুধু এয়ারলাইনগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি নয়, যাত্রী চাহিদার পরিবর্তনও ভূমিকা রাখছে।
চীনা পর্যটকদের মধ্যে প্রচলিত স্বল্প ও মাঝারি দূরত্বের গন্তব্যের পাশাপাশি মিশর, নরওয়ে এবং অন্যান্য দূরপাল্লার পর্যটন গন্তব্যে আগ্রহ বাড়ছে।
এই চাহিদা এয়ারলাইনগুলোর জন্য নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু এবং বিদ্যমান রুটে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানোর ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করছে।
চীনা ও এশিয়া-প্যাসিফিক বিমানবন্দরগুলোর অবস্থান উন্নত হলেও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি বড় হাব সাম্প্রতিক আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রভাবের মুখে পড়েছে।
নিরাপত্তাজনিত কারণে আকাশসীমায় বিধিনিষেধ, কিছু আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনের ফ্লাইট সাময়িক স্থগিত বা কমিয়ে দেওয়া এবং দীর্ঘ বিকল্প রুট ব্যবহারের মতো পরিস্থিতি বিমানবন্দরের scheduled connectivity-তে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এ ধরনের র্যাঙ্কিং নির্দিষ্ট সময়ের ফ্লাইট সূচির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অবস্থান আবার পরিবর্তিত হতে পারে।
২০২৬ সালের OAG Megahubs Index-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের শক্তিশালী উপস্থিতি।
বিশ্বের শীর্ষ ২০টি আন্তর্জাতিক মেগাহাবের মধ্যে আটটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে, যা অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় বেশি।
চীনের আন্তর্জাতিক বিমান বাজারের পুনরুদ্ধার, এশিয়ার দ্রুত বাড়তে থাকা যাত্রী চাহিদা এবং বড় এয়ারলাইনগুলোর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এই অঞ্চলের বিমানবন্দরগুলোর কানেক্টিভিটি আরও বাড়াচ্ছে।
বিশেষ করে গুয়াংঝো, সাংহাই ও হংকংয়ের মতো বিমানবন্দরগুলোর অবস্থান উন্নতি দেখাচ্ছে যে মহামারি-পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক এভিয়েশন নেটওয়ার্কের ভারসাম্য আবারও এশিয়া-প্যাসিফিকের দিকে শক্তিশালী হচ্ছে।
সূত্র: OAG Megahubs 2026