
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর সঙ্গে দেশের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ওপর নির্ভরশীল এই সেবায় দ্বিতীয় একটি যোগ্য অপারেটর যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবায় প্রথমবারের মতো সরাসরি প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হবে।
বর্তমানে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিজেদের ফ্লাইটের পাশাপাশি বিভিন্ন বিদেশি এয়ারলাইনসকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা দিয়ে থাকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। যাত্রীদের চেক-ইন ও বোর্ডিং সহায়তা, ব্যাগেজ ওঠানো-নামানো, র্যাম্প সার্ভিস, গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট পরিচালনা এবং অবতরণের পর উড়োজাহাজকে পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য প্রস্তুত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম এই সেবার অন্তর্ভুক্ত।
তৃতীয় টার্মিনালে দ্বিতীয় অপারেটর যুক্ত হলে বিদেশি এয়ারলাইনসের সামনে বিকল্প তৈরি হবে। তারা সেবার মান, পরিচালন সক্ষমতা, সময়ানুবর্তিতা ও মূল্য বিবেচনায় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে। এর ফলে অপারেটরদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি সেবার মান উন্নয়নের চাপও তৈরি হবে।
একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যকারিতা শুধু আধুনিক টার্মিনাল ভবন বা উন্নত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না। একটি উড়োজাহাজ অবতরণের পর যাত্রী নামানো, ব্যাগেজ সরবরাহ, নতুন যাত্রীর ব্যাগেজ তোলা, উড়োজাহাজে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া এবং পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য সেটিকে প্রস্তুত করার পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সরাসরি যুক্ত।
এই প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হলে তার প্রভাব পড়ে যাত্রী ও এয়ারলাইন—উভয়ের ওপর। বিশেষ করে ব্যাগেজ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, লাগেজ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, পর্যাপ্ত গ্রাউন্ড সাপোর্ট না পাওয়া কিংবা উড়োজাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ডে বিলম্ব একটি বিমানবন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে দ্বিতীয় অপারেটর যুক্ত করার উদ্যোগকে শুধু নতুন একটি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি তৃতীয় টার্মিনালের যাত্রীসেবা ও অপারেশনাল দক্ষতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
তৃতীয় টার্মিনালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে যাচ্ছে ব্যাগেজ ডেলিভারির সময়। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অপারেটরকে ১৫ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে যাত্রীর ব্যাগেজ সরবরাহ করতে হবে।
নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করলে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের বিরুদ্ধে জরিমানার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। এর ফলে ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ যাত্রীসেবাকে নির্দিষ্ট সময় ও কর্মদক্ষতার সূচকের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যাগেজ সরবরাহ করতে না পারলে বেবিচক অপারেটরকে জরিমানা করতে পারবে।
এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে যাত্রীসেবার মান শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, নির্দিষ্ট Key Performance Indicator (KPI) বা কর্মদক্ষতার সূচকের মাধ্যমেও মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী পরিচালন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। নতুন টার্মিনাল বছরে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রী পরিচালনার সক্ষমতা যোগ করবে।
তবে নতুন অবকাঠামো তৈরি করলেই বিমানবন্দরের সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব নয়। একই সঙ্গে প্রয়োজন পর্যাপ্ত গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট, প্রশিক্ষিত জনবল, দ্রুত ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং এবং সময়মতো উড়োজাহাজ প্রস্তুত করার সক্ষমতা।
উদাহরণ হিসেবে, একটি উড়োজাহাজ অবতরণের পর সেটিকে যত দ্রুত নিরাপদভাবে পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব হবে, সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের পক্ষে তত কার্যকরভাবে ফ্লাইট সূচি পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এ কারণে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দক্ষতা বিমানবন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
তৃতীয় টার্মিনালে দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অপারেটর হওয়ার সুযোগ ঘিরে কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নাম আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক Menzies Aviation, সুইজারল্যান্ডের Swissport, তুরস্কের Çelebi Aviation, সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক dnata এবং সিঙ্গাপুরের SATS।
সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তৃতীয় টার্মিনালের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে Menzies Aviation-এর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহের বিষয়টি তুলে ধরেন।
তবে আগ্রহ প্রকাশ করা এবং চূড়ান্তভাবে অপারেটর নির্বাচিত হওয়া এক বিষয় নয়। দ্বিতীয় অপারেটর এখনো চূড়ান্ত হয়নি। অপারেটর নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা রেকর্ড, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত জনবল, আর্থিক সক্ষমতা এবং নির্ধারিত KPI অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা।
আলোচনায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে Menzies Aviation-এর আন্তর্জাতিক কার্যক্রম বেশ বিস্তৃত। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৬৫টি দেশের ৩৪৭টি বিমানবন্দরে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। কর্মী সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার।
২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৫৩ লাখ ফ্লাইটে বিভিন্ন ধরনের সেবা দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং টার্ন এবং প্রায় ৩৭ লাখ ফুয়েলিং টার্ন রয়েছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ৭৬টি কার্গো স্থাপনায় প্রায় ২৪ লাখ টন কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়াতেও প্রতিষ্ঠানটির উপস্থিতি রয়েছে। ভারতের বেঙ্গালুরু বিমানবন্দরে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘমেয়াদি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং লাইসেন্স পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশে কাজের সুযোগ পেলে সেটি প্রতিষ্ঠানটির দক্ষিণ এশীয় কার্যক্রমের আরও একটি সংযোজন হবে।
দ্বিতীয় অপারেটর যুক্ত হওয়ার অর্থ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং একই পরিবেশে একাধিক অপারেটর থাকলে সেবার মান তুলনা করার সুযোগ তৈরি হবে।
দ্রুত ব্যাগেজ সরবরাহ, উন্নত aircraft turnaround time, পর্যাপ্ত গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট, দক্ষ জনবল, নিরাপত্তা এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নিশ্চিত করতে পারলে বিমানও বিদেশি এয়ারলাইনসের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবসা ধরে রাখার সুযোগ পাবে।
অন্যদিকে দ্বিতীয় অপারেটর তুলনামূলক উন্নত সেবা দিতে পারলে এয়ারলাইনসের সামনে বিকল্প থাকবে। এর ফলে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবায় একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীলতার পরিবর্তে সেবার মানের ভিত্তিতে প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তৃতীয় টার্মিনাল বাংলাদেশের বিমান পরিবহন অবকাঠামোর অন্যতম বড় প্রকল্প। কিন্তু নতুন ভবন, বোর্ডিং ব্রিজ কিংবা অত্যাধুনিক ব্যাগেজ সিস্টেমের পাশাপাশি যাত্রী শেষ পর্যন্ত কত দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সেবা পাচ্ছেন, সেটিই টার্মিনালের কার্যকারিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হবে।
দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার যুক্ত হলে প্রতিযোগিতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শুধু নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত করাই যথেষ্ট নয়। অপারেটরদের জন্য একই ধরনের সেবার মানদণ্ড, নিয়মিত কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, নিরাপত্তা তদারকি এবং ব্যাগেজ ডেলিভারি ও টার্নঅ্যারাউন্ড সময়ের মতো সূচক কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত সেবার মান, নিরাপত্তা, সময়ানুবর্তিতা, দক্ষতা ও মূল্য—এই বিষয়গুলোর বাস্তব উন্নতি ঘটলেই দ্বিতীয় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার যুক্ত করার সুফল যাত্রীরা অনুভব করতে পারবেন।
তথ্যসূত্র: বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, Menzies Aviation-এর ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট প্রকাশিত তথ্য।