
এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিবেদন
হাইজ্যাক, নাশকতা কিংবা আকস্মিক বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট দেখা দিলে কোন বিমানবন্দরে কোন বাহিনী প্রথম সাড়া দেবে—তা নির্ধারণ করে দিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। দেশের আটটি বিমানবন্দরের জন্য প্রাথমিক ও বিকল্প সাড়াদানকারী সংস্থা নির্ধারণের পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী, র্যাব এবং পুলিশের সমন্বিত ভূমিকা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আসন্ন International Civil Aviation Organization (ICAO)-এর নিরাপত্তা অডিট সামনে রেখে বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা, সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা এবং যাত্রী ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর পর অনুষ্ঠিত জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা কমিটির (NCASC) ১৩তম সভায় সিদ্ধান্তগুলো নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়। পরে বাস্তবায়নের জন্য গত ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যানের কাছে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাঠানো হয়।
মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বড় ধরনের জরুরি নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রাথমিক সাড়াদানকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে বিমান বাহিনী ঘাঁটি এ কে খন্দকার। বিকল্প হিসেবে থাকবে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ৪৬ পদাতিক ব্রিগেড ও র্যাব-১।
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাথমিক দায়িত্বে থাকবে বিমান বাহিনী ঘাঁটি জহুরুল হক। বিকল্প হিসেবে রাখা হয়েছে নৌবাহিনী ঘাঁটি ঈশা খাঁ ও র্যাব-৭।
ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাথমিক সাড়াদানকারী হিসেবে থাকবে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (SMP)। বিকল্প হিসেবে থাকবে র্যাব-৯ ও সিলেট ক্যান্টনমেন্টের ১৭ পদাতিক ডিভিশন।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের জন্য প্রাথমিক সাড়াদানকারী হিসেবে বিমান বাহিনী ঘাঁটি কক্সবাজার এবং বিকল্প হিসেবে র্যাব-১৫ ও রামু ক্যান্টনমেন্টের ১০ পদাতিক ডিভিশন নির্ধারণ করা হয়েছে।
সৈয়দপুর বিমানবন্দরে প্রাথমিক দায়িত্বে থাকবে রংপুর ক্যান্টনমেন্টের ৬৬ পদাতিক ডিভিশন এবং বিকল্প হিসেবে র্যাব-১৩ ও নীলফামারী জেলা পুলিশ।
শাহ মখদুম বিমানবন্দরে প্রাথমিক সাড়াদানকারী হিসেবে পুলিশের Counter Terrorism and Transnational Crime (CTTC) ইউনিট এবং বিকল্প হিসেবে র্যাব-৫ ও বগুড়া ক্যান্টনমেন্টের ১১ পদাতিক ডিভিশনকে রাখা হয়েছে।
যশোর বিমানবন্দরে প্রাথমিক দায়িত্বে থাকবে বিমান বাহিনী ঘাঁটি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান; বিকল্প হিসেবে ৫৫ পদাতিক ডিভিশন ও র্যাব-৬।
বরিশাল বিমানবন্দরে প্রাথমিক সাড়াদানকারী হিসেবে র্যাব-৮ এবং বিকল্প হিসেবে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ ও লেবুখালী ক্যান্টনমেন্টের ৭ পদাতিক ডিভিশনকে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিমানবন্দরে হাইজ্যাকিং, নাশকতা বা বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকট দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে যাতে অস্পষ্টতা তৈরি না হয়, সে জন্য আন্তঃসংস্থা সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
‘In Aid to Civil Power’-এর আওতায় বিমানবন্দরগুলোতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সদস্য মোতায়েনের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন গ্রহণের ব্যবস্থা করতে বেবিচককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে দ্রুত সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য জরুরি পরিস্থিতিতে কোন সংস্থা কী দায়িত্ব পালন করবে এবং কীভাবে সমন্বিত সাড়া দেওয়া হবে, তা আগে থেকেই স্পষ্ট রাখা।
নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে বিমানবন্দরগুলোর ল্যান্ডসাইড এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, জনসমাগম এবং নিরাপত্তা তল্লাশির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নকে (APBn) আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একজন বিমানবন্দর প্রবেশ পাসধারীর সঙ্গে সর্বোচ্চ দুইজন দর্শনার্থী প্রবেশ করতে পারবেন বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে। অতিরিক্ত দর্শনার্থী নিয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
নিয়মটি সম্পর্কে যাত্রী ও দর্শনার্থীদের সচেতন করতে বিমানবন্দর এলাকায় পর্যাপ্ত নির্দেশনামূলক সাইনেজ স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ক্যানোপি ও ল্যান্ডসাইড এলাকায় যানজট, অনিয়ন্ত্রিত লোকসমাগম, ভিক্ষুক, ছিন্নমূল শিশু, ভবঘুরে এবং অবৈধ লাগেজ র্যাপারদের নিয়ন্ত্রণেও নিয়মিত অভিযান চালাতে বলা হয়েছে।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় VIP ও CIP যাত্রীদেরও নিয়মিত নিরাপত্তা স্ক্রিনিংয়ের আওতায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করে VIP-CIPসহ সব যাত্রীর নিরাপত্তা তল্লাশি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
শাহজালাল বিমানবন্দরের VIP ও CIP কার পার্কিং এলাকায় দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকা Under Vehicle Scanning System (UVSS) দ্রুত সচল অথবা পুনঃস্থাপনের নির্দেশও এসেছে।
এ ছাড়া জনবল ও কারিগরি সমস্যার কারণে বন্ধ থাকা কাস্টমসের হ্যান্ড ব্যাগেজ স্ক্রিনিং মেশিন ১৫ দিন থেকে এক মাসের মধ্যে মেরামত করে চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিদেশি দূতাবাস বা মিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা VIP বা CIP সুবিধা চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পূর্বানুমোদন নিতে হবে। অনুমোদন ছাড়া কাউকে সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ বা বিশেষ প্রটোকল সুবিধা না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিমানবন্দর ও এর আশপাশের সংরক্ষিত আকাশসীমায় অননুমোদিত ড্রোন প্রবেশ ঠেকাতে আধুনিক Anti-Drone System স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে ২০২০ সালের বিদ্যমান ড্রোন নীতিমালা পর্যালোচনা করে নতুন Drone Registration and Flying Rules, 2026 প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিমানবন্দরের মতো সংবেদনশীল স্থাপনার আকাশসীমায় অননুমোদিত ড্রোন শনাক্ত ও মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
বিদেশগামী যাত্রীদের লাগেজ নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ট্রানজিট বা ডিপার্চার বিমানবন্দরে কোনো যাত্রীর অনুপস্থিতিতে তার চেকড লাগেজ খোলা হলে অথবা সেখান থেকে কোনো সামগ্রী সরানো হলে লাগেজে এ বিষয়ে দৃশ্যমান সিকিউরিটি সিল বা তথ্য স্লিপ সংযুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
এর মাধ্যমে লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের নিরাপত্তা ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে আরোপিত High-Risk Cargo and Mail (HRCM) স্ট্যাটাস প্রত্যাহারে কূটনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় তৎপরতা আরও জোরদারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
HRCM-এর কারণে ইউরোপগামী কার্গো ও মেইলের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজন হয়।
তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন বা আন্তর্জাতিক অডিটে ভালো ফলাফল HRCM স্ট্যাটাস স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাহার করবে না। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।
বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমডোর মো. আসিফ ইকবাল বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পর প্রতিটি বিমানবন্দরে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়াদানকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় এবং বিমানবন্দরের প্রবেশমুখে নিরাপত্তা তল্লাশি আরও জোরদার করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, “আসন্ন ICAO অডিটে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা তুলে ধরতে এবং যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।”
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে বেবিচকের একাধিক তদারকি দল মাঠপর্যায়ে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
আসন্ন ICAO নিরাপত্তা অডিটকে সামনে রেখে নেওয়া এসব পদক্ষেপ শুধু অডিটের প্রস্তুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হাইজ্যাক বা নাশকতার মতো বড় সংকটে দ্রুত সাড়া, ল্যান্ডসাইডে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, VIP-CIP স্ক্রিনিং, ড্রোন প্রতিরোধ, লাগেজ ও কার্গো নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে আগাম দায়িত্ব বণ্টন—সব মিলিয়ে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে সমন্বিত ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কাঠামো আরও শক্তিশালী করাই এখন মূল লক্ষ্য।
সূত্র: জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা কমিটির সিদ্ধান্ত