
বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে প্রথমবারের মতো Aviation Security বিষয়ক Air Navigation Order (ANO) জারি করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাওয়া ICAO-এর আন্তর্জাতিক অডিট সামনে রেখে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর জারি হওয়া ANO একই দিন থেকে কার্যকর হয়েছে। এতে বিমানবন্দর, এয়ারলাইনস, যাত্রী, লাগেজ, উড়োজাহাজ ও কার্গোসহ বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের দায়িত্ব ও করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমডোর মোঃ আসিফ ইকবাল বলেন, আসন্ন ICAO অডিটে এ ধরনের নিরাপত্তা বিধিবিধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে। নতুন ANO-এর মাধ্যমে বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলোকে আরও সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, National Civil Aviation Security Programme (NCASP)-এ বিমানবন্দরের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। তবে সংবেদনশীল তথ্য থাকায় পুরো NCASP প্রকাশ করা সম্ভব নয়। নতুন ANO মূলত NCASP-এর সাধারণ ও জনসাধারণের জন্য প্রকাশযোগ্য অংশকে আইনি কাঠামোর মধ্যে এনেছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ জানান, নতুন ANO জারির পর যাত্রীদের জন্য নতুন কোনো নিরাপত্তা তল্লাশি ব্যবস্থা চালু করা হয়নি। আগে থেকেই প্রচলিত নিরাপত্তা প্রটোকলগুলোই অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে ANO এসব ব্যবস্থাকে আনুষ্ঠানিক আইনি ভিত্তি দিয়েছে।
নতুন ANO-তে যাত্রীদের উচ্ছৃঙ্খল বা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণকে চারটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। সন্দেহজনক বা মৌখিক হুমকি থেকে শুরু করে ককপিটে অনুপ্রবেশের চেষ্টা বা বাস্তব অনুপ্রবেশ পর্যন্ত বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়েছে।
যাত্রীর আচরণ বা শারীরিক অবস্থার কারণে প্রয়োজন হলে এয়ারলাইনস চেক-ইন বন্ধ বা বোর্ডিং প্রত্যাখ্যান করতে পারবে। গেটে বোর্ডিং প্রত্যাখ্যান করা হলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীর হোল্ড ব্যাগেজ উড়োজাহাজ থেকে নামিয়ে তাকে ল্যান্ডসাইড এলাকায় নিয়ে যেতে হবে এবং ফ্লাইট ম্যানিফেস্ট থেকেও তার নাম বাদ দিতে হবে। গুরুতর ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া যাবে।
এ ছাড়া নিরাপত্তা তল্লাশি প্রত্যাখ্যানকারী কোনো যাত্রীকে উড়োজাহাজে উঠতে দেওয়া হবে না। কেবিন ও হোল্ড ব্যাগেজের স্ক্রিনিং বা সার্চের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য হবে।
নতুন ANO অনুযায়ী, যাত্রীদের তরল, অ্যারোসল ও জেল প্রতিটি সর্বোচ্চ ১০০ মিলিলিটার ধারণক্ষমতার পাত্রে বহন করতে হবে। এসব পাত্র সর্বোচ্চ ১ লিটার ধারণক্ষমতার স্বচ্ছ ও পুনরায় বন্ধ করা যায় এমন প্লাস্টিক ব্যাগে রাখতে হবে।
১০০ মিলিলিটারের বেশি ধারণক্ষমতার কোনো পাত্র আংশিক খালি থাকলেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, নিরাপত্তা-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় এসকর্ট ছাড়া প্রবেশের সুযোগ রয়েছে এমন কর্মী এবং সংবেদনশীল বিমান নিরাপত্তা তথ্যের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ শাখা (Special Branch) এসব যাচাইয়ের দায়িত্ব পালন করবে।
বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমডোর মোঃ আসিফ ইকবাল স্বীকার করেছেন, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এখনো কিছু জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। জনবল নিয়োগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এদিকে জনবল ঘাটতি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ল্যান্ডসাইড নিরাপত্তার দায়িত্ব আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নকে দেওয়া হয়েছে। পূর্ণ জনবল নিয়োগের পর বেবিচক নিজস্বভাবে এ দায়িত্ব নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
নিরাপত্তা সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি চীন থেকে ২৫টি Explosive Trace Detector পাওয়া গেছে। পাশাপাশি Dual-view baggage screening machine এবং চারটি নতুন body scanner যুক্ত করা হয়েছে।
বেবিচক জানিয়েছে, বিমানবন্দরের জনবল, সরঞ্জাম, অবকাঠামো ও নিরাপত্তা সুবিধার উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে আরও আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
নতুন Aviation Security ANO জারির পাশাপাশি সরকার চার দশকের বেশি সময় ধরে কার্যকর থাকা Civil Aviation Rules, 1984 পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন বিধিমালার মাধ্যমে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে ICAO-এর অডিট শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এ অডিটে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান ও Recommended Practices-এর সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হবে। অডিটের ফলাফল বাংলাদেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও গ্রেডিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।