
এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিবেদন
রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণে প্রায় ১০৭ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের প্রায় চার বছর পরও পুরো কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘসূত্রতায় পরিকল্পিত বেশ কিছু সুবিধা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
অন্যদিকে রাজশাহীর আকাশপথের যোগাযোগ এখন মূলত ঢাকা রুটকেন্দ্রিক। এই রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ফ্লাইট পরিচালনা করছে। গত বছরের মে থেকে নভোএয়ারের ফ্লাইট বন্ধ থাকায় রুটটিতে প্রতিযোগিতাও কমেছে।
স্থানীয় যাত্রীদের অভিযোগ, ফ্লাইটের সীমিত বিকল্পের কারণে ব্যস্ত সময়ে টিকিট পাওয়া কঠিন হচ্ছে। আগেভাগে টিকিট না কাটলে ভাড়াও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
শাহ মখদুম বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় টার্মিনাল ও যাত্রীসেবার উন্নয়ন, পার্কিং সুবিধা বৃদ্ধি, একসঙ্গে একাধিক উড়োজাহাজ রাখার সক্ষমতা এবং কার্গো উড়োজাহাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু প্রকল্পের সব কাজ এখনো শেষ না হওয়ায় পরিকল্পিত সুবিধার পুরো সুফল পাচ্ছেন না যাত্রীরা।
রাজশাহীর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় শহরের বিমানবন্দরটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও বাস্তবায়নের ধীরগতি স্থানীয় যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে।
শুধু প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা নয়, বিমানবন্দরের বৈদ্যুতিক অবকাঠামোর কয়েকটি বিষয় নিয়েও উদ্বেগ উঠে এসেছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পরিদর্শন প্রতিবেদনে উচ্চ ভোল্টেজ প্যানেল, ট্রান্সফরমার, জেনারেটর ও জরুরি ফিডার প্যানেলের কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে এসব সমস্যা দ্রুত সংস্কার বা প্রয়োজন অনুযায়ী সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষ করে সচল বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় সরাসরি ডিসচার্জের বিষয়টি উল্লেখ করে আগুনের সূত্রপাতের আশঙ্কার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া ট্রান্সফরমার কক্ষে সিলিকা জেল না থাকা, পুরোনো সরঞ্জাম এবং দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার বিষয়টিও চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিমানবন্দরের রানওয়ের Aeronautical Ground Lighting (AGL) ব্যবস্থা বর্তমানে সচল থাকলেও এর অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ না থাকার বিষয়টি পরিদর্শনে উঠে এসেছে।
AGL ব্যবস্থা উড়োজাহাজের নিরাপদ রানওয়ে অপারেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ প্রস্তুত না থাকলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিকল হওয়ার পর দ্রুত মেরামত কঠিন হয়ে পড়তে পারে এবং অপারেশনে বিঘ্নের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ কারণে আধুনিকায়ন প্রকল্পের পাশাপাশি বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও অপারেশনাল অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
শাহ মখদুম বিমানবন্দরের রানওয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্যও পৃথক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যশোর, সৈয়দপুর ও শাহ মখদুম বিমানবন্দরের রানওয়েতে Asphalt Concrete-এর নতুন স্তর দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৭-২৮ মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
রানওয়ের কাঠামোগত সক্ষমতা উন্নত হলে ভবিষ্যতে বিমানবন্দরটির অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু রানওয়ে উন্নয়ন করলেই বড় উড়োজাহাজ পরিচালনা নিশ্চিত হয় না। উড়োজাহাজের ধরন অনুযায়ী রানওয়ের দৈর্ঘ্য ও শক্তি, ট্যাক্সিওয়ে, অ্যাপ্রন, নেভিগেশন সুবিধা, অগ্নিনিরাপত্তা সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক অনুমোদনও গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে রাজশাহী থেকে সরাসরি যাত্রীবাহী বিমান যোগাযোগ মূলত ঢাকার সঙ্গে সীমাবদ্ধ।
রুটটিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ফ্লাইট পরিচালনা করলেও নভোএয়ারের ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার পর যাত্রীদের বিকল্প কমেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নিয়মিত যাত্রীদের ভাষ্য, আগেভাগে টিকিট কিনলে চার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া গেলেও জরুরি প্রয়োজনে এক বা দুই দিন আগে টিকিট কিনতে গেলে অনেক সময় ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
এয়ারলাইনসের টিকিটের মূল্য সাধারণত আসনসংখ্যা, চাহিদা, বুকিংয়ের সময় এবং সংশ্লিষ্ট ভাড়া শ্রেণির ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। ফলে শেষ মুহূর্তে কম মূল্যের আসন শেষ হয়ে গেলে বেশি দামের টিকিটই অবশিষ্ট থাকতে পারে।
তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, রাজশাহী রুটে আরও ফ্লাইট বা এয়ারলাইন যুক্ত হলে আসনের সরবরাহ ও প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং যাত্রীদের বিকল্পও বাড়বে।
রাজশাহী দেশের গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ও বাণিজ্যিক অঞ্চলগুলোর একটি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, বিমানবন্দরে কার্যকর কার্গো সুবিধা গড়ে উঠলে আম, সবজি, রেশমসহ বিভিন্ন কৃষি ও স্থানীয় পণ্য দ্রুত পরিবহনের সুযোগ বাড়তে পারে।
বিশেষ করে দ্রুত নষ্ট হয় এমন উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে আকাশপথে পরিবহন নতুন বাজার তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে নিয়মিত কার্গো ফ্লাইট চালু করতে শুধু বিমানবন্দরের অবকাঠামো যথেষ্ট নয়। পর্যাপ্ত পণ্যের চাহিদা, কার্গো টার্মিনাল ও হ্যান্ডলিং সুবিধা, সংরক্ষণব্যবস্থা, কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং এয়ারলাইনসের বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতাও গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের একটি অংশ শাহ মখদুম বিমানবন্দরকে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, সরাসরি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ তৈরি হলে রাজশাহীর ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পর্যটনে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে একটি বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার উপযোগী করতে শুধু রানওয়ে সম্প্রসারণ যথেষ্ট নয়।
এর জন্য আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনাল, ইমিগ্রেশন, কাস্টমস, এভিয়েশন সিকিউরিটি, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, কার্গো ব্যবস্থাপনা, নেভিগেশন ও অগ্নিনিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক মান ও নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করতে হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুটে পর্যাপ্ত যাত্রী ও বাণিজ্যিক চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে স্থানীয়দের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দাবি থাকলেও সেটিকে এখনই অনুমোদিত পরিকল্পনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
শাহ মখদুম বিমানবন্দরের সামনে এখন একাধিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—দীর্ঘদিন ধরে চলা আধুনিকায়ন প্রকল্প শেষ করা, চিহ্নিত বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ঝুঁকি দূর করা, রানওয়ে ও অপারেশনাল অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং রাজশাহী রুটে পর্যাপ্ত ফ্লাইট নিশ্চিত করা।
প্রায় ১০৭ কোটি টাকার প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ের প্রায় চার বছর পরও অসম্পূর্ণ থাকায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—এর বাকি কাজ কবে শেষ হবে এবং পরিকল্পিত সুবিধাগুলো কবে পুরোপুরি পাবেন যাত্রীরা।
রাজশাহীর আঞ্চলিক অর্থনীতি ও যোগাযোগে বিমানবন্দরটির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নতুন পরিকল্পনার পাশাপাশি ইতোমধ্যে নেওয়া প্রকল্পের সময়মতো বাস্তবায়ন ও বিদ্যমান অবকাঠামোর নিরাপদ পরিচালনাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনসংক্রান্ত তথ্য, বিমানবন্দর আধুনিকায়ন প্রকল্পের তথ্য এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য