
বাংলাদেশ থেকে বিদেশগামী আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের টিকিটের দাম অনেক সময় প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেশি হয়ে থাকে। এর পেছনে শুধু এয়ারলাইনসের মুনাফাকে দায়ী করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয়, কর ও সরকারি চার্জ, বিমানবন্দর ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যয়, সীমিত প্রতিযোগিতা এবং নির্দিষ্ট রুটে অতিরিক্ত চাহিদাসহ একাধিক কারণ একসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিমানভাড়াকে প্রভাবিত করে।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার অন্যতম বড় ব্যয় হলো Jet A-1 fuel। বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের দাম বাড়লে এয়ারলাইনসের পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে যায়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত টিকিটের দামে পড়ে।
এর সঙ্গে উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, ক্রু, বিমানবন্দর ব্যবহার, নেভিগেশন এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও যুক্ত হয়। ফলে শুধু জ্বালানি নয়, সামগ্রিক অপারেটিং কস্টও আন্তর্জাতিক ভাড়ার ওপর প্রভাব ফেলে।
আন্তর্জাতিক যাত্রায় মূল টিকিট মূল্যের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের কর ও সরকারি চার্জ দিতে হয়। এর মধ্যে Embarkation Fee, Airport Development Fee এবং Passenger Security Fee-সহ বিভিন্ন চার্জ রয়েছে।
CAAB-এর প্রকাশিত কাঠামো অনুযায়ী আন্তর্জাতিক যাত্রীর জন্য Embarkation Fee ৫০০ টাকা। এছাড়া নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক গন্তব্যের ক্ষেত্রে Airport Development Fee ও Passenger Security Fee প্রযোজ্য হয়।
ফলে কোনো রুটে এয়ারলাইনের Base Fare তুলনামূলক কম হলেও কর ও বিভিন্ন চার্জ যোগ হওয়ার পর যাত্রীর চূড়ান্ত পরিশোধযোগ্য অর্থ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
এয়ারলাইনসকে বিমানবন্দর ব্যবহারের জন্য Landing, Parking, Security, Boarding Bridge, Ground Handling এবং অন্যান্য সেবার জন্য বিভিন্ন ধরনের চার্জ দিতে হয়। এসব ব্যয়ও শেষ পর্যন্ত বিমানভাড়ার কাঠামোর মধ্যে প্রতিফলিত হতে পারে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রী ও ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব সেবার সক্ষমতা ও ব্যয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক বিমানভাড়া বেশি হওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো কিছু রুটে সীমিত প্রতিযোগিতা ও আসনসংখ্যা।
একই রুটে একাধিক এয়ারলাইন প্রতিযোগিতা করলে যাত্রী আকর্ষণে ভাড়া কমানোর চাপ থাকে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট রুটে অপারেটরের সংখ্যা কম হলে কিংবা আসনসংখ্যা সীমিত থাকলে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাড়াও দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
২০২৫ সালে এয়ারলাইনস খাতের প্রতিনিধিরা কিছু Middle East রুটে ফ্লাইট কমে যাওয়া এবং টিকিট bulk booking বা hoarding-এর কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগও তুলেছিলেন।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানযাত্রার বড় একটি অংশ Middle East-কেন্দ্রিক। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমানসহ বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় এসব রুটে নিয়মিত যাত্রী চাহিদা রয়েছে।
এর সঙ্গে ওমরাহ ও অন্যান্য ধর্মীয় ভ্রমণ যুক্ত হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে চাহিদা আরও বেড়ে যায়। তখন কম দামের Fare Class দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ায় যাত্রীদের উচ্চমূল্যের টিকিট কিনতে হয়।
সব আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ঢাকা থেকে পর্যাপ্ত সরাসরি ফ্লাইট নেই। ফলে অনেক যাত্রীকে Doha, Dubai, Abu Dhabi, Muscat, Sharjah বা Delhi-এর মতো হাব হয়ে গন্তব্যে যেতে হয়।
Connecting flight-এর ক্ষেত্রে একাধিক বিমানবন্দর ও এয়ারলাইন ব্যবহারের কারণে মোট ভাড়া বাড়তে পারে। পাশাপাশি সরাসরি ফ্লাইটের সীমিত আসন থাকলেও চাহিদা বেশি হলে ভাড়া দ্রুত বাড়ার সুযোগ থাকে।
একই গন্তব্যে ঢাকা থেকে ভাড়া অনেক সময় কলকাতা বা দিল্লির তুলনায় বেশি দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে ২০২৫ সালের একটি তুলনায় Dhaka–Bangkok রুটের সর্বনিম্ন ভাড়া প্রায় ২৩১ ডলার, যেখানে Kolkata–Bangkok প্রায় ১৬৭ ডলার এবং Delhi–Bangkok প্রায় ১৪০ ডলার ছিল।
একইভাবে Dhaka–Jeddah রুটে প্রায় ৫৫২ ডলার ভাড়ার বিপরীতে Delhi–Jeddah রুটে প্রায় ৩০৭ ডলার ভাড়া পাওয়া যাচ্ছিল।
তবে এ ধরনের তুলনা করার সময় ভ্রমণের তারিখ, Fare Class, এয়ারলাইন, ব্যাগেজ, Stopover এবং ট্যাক্স-চার্জের পার্থ্যক্যও বিবেচনায় নিতে হয়।
বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক বিমানভাড়া নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করে—
জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় + কর ও সরকারি চার্জ + বিমানবন্দর ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যয় + সীমিত প্রতিযোগিতা + আসনসংখ্যা + রুটভিত্তিক চাহিদা = চূড়ান্ত বিমানভাড়া।
এখানে Base Fare এবং Tax/Charge এক বিষয় নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল ভাড়া খুব বেশি না হলেও বিভিন্ন সরকারি কর ও বিমানবন্দরসংক্রান্ত চার্জ যুক্ত হওয়ার পর যাত্রীর মোট খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
সাম্প্রতিক শিল্পখাতের আলোচনায় ঢাকা–কুয়ালালামপুর রুটে সরকারি Tax ও Excise Duty-এর পরিমাণ প্রায় ৯,৮৯০ টাকা, বিপরীতে Kuala Lumpur–Dhaka যাত্রায় প্রায় ২,০০০ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের পার্থক্যও যাত্রীদের মোট ভাড়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক বিমানভাড়া তুলনামূলকভাবে কমাতে শুধু এয়ারলাইনসকে ভাড়া কমানোর আহ্বান জানানো যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে আরও বেশি এয়ারলাইনকে বাজারে আসার সুযোগ, পর্যাপ্ত স্লট, নতুন আন্তর্জাতিক রুট, প্রতিযোগিতামূলক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, বিমানবন্দর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর-চার্জের কাঠামো পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে ঢাকার বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়বে। নতুন এয়ারলাইন ও রুট বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে যাত্রীদের জন্য আরও প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
অতএব, বাংলাদেশ থেকে বিদেশ যাওয়ার টিকিট কেন অনেক সময় বেশি—এর উত্তর শুধু ‘এয়ারলাইন বেশি লাভ করছে’ নয়। বরং জ্বালানি, পরিচালন ব্যয়, কর-চার্জ, বিমানবন্দর ব্যয়, সীমিত আসন, কম প্রতিযোগিতা এবং অতিরিক্ত চাহিদা—সবকিছুর সম্মিলিত প্রভাবেই আন্তর্জাতিক বিমানভাড়া নির্ধারিত হয়।
Source: Cap. Abdullah