
বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচল খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে Sustainable Aviation Fuel (SAF) বা টেকসই বিমান জ্বালানি ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে বিভিন্ন দেশ। পরিবেশবান্ধব এভিয়েশন নিশ্চিত করতে বিশ্বের বড় এয়ারলাইন ও বিমানবন্দরগুলো SAF ব্যবহারে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও SAF ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এভিয়েশন খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ, যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো বড় অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
SAF মূলত প্রচলিত জেট ফুয়েলের বিকল্প একটি টেকসই জ্বালানি, যা বিভিন্ন জৈব উৎস থেকে তৈরি করা হয়। কৃষি বর্জ্য, ব্যবহৃত রান্নার তেল, উদ্ভিজ্জ তেল, পৌর বর্জ্য এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎস থেকে SAF উৎপাদন করা সম্ভব। প্রচলিত জেট ফুয়েলের তুলনায় SAF ব্যবহারে জীবনচক্রের হিসাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কমানো যায়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে SAF উৎপাদন ও ব্যবহারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, সিঙ্গাপুর ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ SAF উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন এবং এয়ারলাইনগুলোর মাধ্যমে এর ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশেও SAF উৎপাদনের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের কৃষিপ্রধান অর্থনীতির কারণে ধানের খড়, আখের বর্জ্য, বিভিন্ন কৃষিজ অবশিষ্টাংশ এবং খাদ্য শিল্প থেকে উৎপন্ন বর্জ্য SAF তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এ ছাড়া দেশের বড় শহরগুলোতে প্রতিদিন উৎপন্ন বিপুল পরিমাণ পৌর বর্জ্য থেকেও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে SAF উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। ব্যবহৃত রান্নার তেল সংগ্রহ করে জ্বালানি তৈরির উদ্যোগও বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে SAF চালু করতে হলে প্রথমে একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োজন। এর আওতায় SAF উৎপাদন, ব্যবহার, বিনিয়োগ সুবিধা, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো নির্ধারণ করা যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, জ্বালানি ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি একটি বিশেষ SAF টাস্কফোর্স গঠন করে সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে।
প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশে পরীক্ষামূলকভাবে SAF ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সসহ দেশের অন্যান্য এয়ারলাইনগুলোকে এই উদ্যোগে যুক্ত করা হলে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক ব্যবহারের পথ সহজ হবে।
তবে SAF বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বর্তমানে SAF উৎপাদন খরচ প্রচলিত বিমান জ্বালানির তুলনায় বেশি। পাশাপাশি প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল এবং নির্ভরযোগ্য কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশে SAF শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নত দেশগুলোর প্রযুক্তিগত সহযোগিতা নিয়েও এই খাতে এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশ বর্তমানে নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আধুনিক বিমানবন্দর, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রযুক্তির পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সঠিক পরিকল্পনা ও সময়োপযোগী উদ্যোগ নেওয়া গেলে SAF শুধু বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতকে পরিবেশবান্ধব করবে না, পাশাপাশি নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।