
এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিবেদন
রানওয়ে সম্প্রসারণ থেকে আধুনিক নেভিগেশন সুবিধা—বরিশাল বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে রয়েছে নানা পরিকল্পনা। কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়নের উদ্যোগের বিপরীতে বিমানবন্দরটির সবচেয়ে বড় সংকট এখন যাত্রী ও নিয়মিত ফ্লাইটের অভাব।
বর্তমানে ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে সপ্তাহে মাত্র তিন দিন ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও রোববার ছাড়া রাজধানীর সঙ্গে বরিশালের নিয়মিত আকাশ যোগাযোগ নেই।
আর ৭৪ আসনের ড্যাশ-৮ কিউ৪০০ উড়োজাহাজে প্রতিটি ফ্লাইটে গড়ে যাত্রী হচ্ছে মাত্র ২০ থেকে ২২ জন। ফলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন খালি থাকছে। যাত্রীস্বল্পতার কারণে রুটটিতে ফ্লাইট বাড়ানোর বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
বরিশাল বিমানবন্দরের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে যাত্রীস্বল্পতাকে।
৭৪ আসনের উড়োজাহাজে গড়ে ২০ থেকে ২২ জন যাত্রী হলে আসনের বড় অংশই খালি থেকে যায়। এমন পরিস্থিতিতে একটি ফ্লাইট পরিচালনার জ্বালানি, ক্রু, বিমানবন্দর ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের বিপরীতে পর্যাপ্ত রাজস্ব অর্জন এয়ারলাইন্সের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
বর্তমানে ঢাকা-বরিশাল রুটে বিমান বাংলাদেশের ভাড়া প্রায় ৪ হাজার ৭৫০ টাকা পর্যন্ত। স্থানীয়দের মতে, সীমিত ফ্লাইটের পাশাপাশি ভাড়ার বিষয়টিও অনেক যাত্রীর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
বিশেষ করে পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকার সঙ্গে বরিশালের সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ায় যাত্রীদের সামনে বিকল্প বেড়েছে।
একসময় ঢাকা-বরিশাল রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও নভোএয়ারও নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করত।
ফলে যাত্রীদের সামনে একাধিক এয়ারলাইন্স, সময়সূচি ও ভাড়ার বিকল্প ছিল।
পদ্মা সেতু চালুর পর সড়কপথে যাতায়াতের সময় কমে আসায় আকাশপথের যাত্রী চাহিদায়ও পরিবর্তন আসে। এর প্রভাব পড়ে এয়ারলাইন্সগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রমে। একপর্যায়ে বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলো এ রুট থেকে সরে যায় বা তাদের কার্যক্রম কমিয়ে দেয়।
তবে স্থানীয়দের মতে, সড়ক যোগাযোগ সহজ হওয়ার অর্থ আকাশ যোগাযোগের প্রয়োজন শেষ হয়ে যাওয়া নয়।
চিকিৎসা, ব্যবসা, চাকরি কিংবা জরুরি প্রয়োজনে অল্প সময়ে রাজধানীতে পৌঁছাতে এখনো আকাশপথের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর এলাকায় অবস্থিত বিমানবন্দরটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৯০-৯১ সালে। ১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে এটি বাণিজ্যিকভাবে চালু হয়।
বর্তমানে বিমানবন্দরের রানওয়ে ৬ হাজার ফুট দীর্ঘ এবং ১০০ ফুট প্রশস্ত। ভবিষ্যতে রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৮ হাজার ৫০০ ফুটে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর পাশাপাশি Airfield Ground Lighting (AGL), Instrument Landing System (ILS), DVOR, DME ও PAPI স্থাপন বা উন্নয়নসহ বিভিন্ন আধুনিকায়ন পরিকল্পনা রয়েছে।
কনভেয়ার বেল্ট ও এপ্রোন সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে বিমানবন্দরটির যাত্রীসেবা ও অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়তে পারে।
বিমানবন্দর ব্যবস্থাপক সঞ্জয় কুমার রায় জানিয়েছেন, উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যাত্রীসেবার পাশাপাশি বিমানবন্দরের নিরাপত্তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি বিমানবন্দরের বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার কয়েকটি বিষয়ও সামনে এসেছে।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বিভাগের সুপারভাইজার মনমথো সরকার জানিয়েছেন, সীমানাপ্রাচীরের প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি স্থানে বাইরে থেকে বিমানবন্দরের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।
রানওয়েতে উড়োজাহাজকে প্রয়োজনীয় ভিজ্যুয়াল নির্দেশনা দিতে ব্যবহৃত PAPI লাইটের কিছু অংশ নষ্ট থাকার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বিমানবন্দরের মতো নিয়ন্ত্রিত স্থাপনায় সীমানা নিরাপত্তার দুর্বলতা এবং গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল সরঞ্জামের ত্রুটি দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারণ নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান বিমানবন্দরের নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন অপারেশন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের দাবি, ঢাকা-বরিশাল রুটে অন্তত সপ্তাহে পাঁচ দিন নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া এবং বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোকে আবারও এই রুটে আকৃষ্ট করার উদ্যোগ চান তারা।
তাদের যুক্তি, ফ্লাইটের সংখ্যা ও সময়সূচি যাত্রীবান্ধব হলে চিকিৎসাপ্রার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী এবং জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারীদের একটি অংশ আবার আকাশপথে ফিরতে পারেন।
তবে এয়ারলাইন্সের জন্য নিয়মিত ফ্লাইট বাড়ানোর সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত যাত্রী চাহিদা, আসন পূরণের হার, পরিচালন ব্যয় এবং রুটটির বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতার ওপরও নির্ভর করবে।
বরিশাল বিমানবন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনছে—অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি যাত্রী ও ফ্লাইট কীভাবে বাড়ানো যাবে?
রানওয়ে ৮ হাজার ৫০০ ফুটে সম্প্রসারণ কিংবা ILS, DVOR, DME, AGL ও অন্যান্য আধুনিক সুবিধা যুক্ত হলে বিমানবন্দরের প্রযুক্তিগত ও অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়তে পারে। কিন্তু শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই কোনো রুটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাত্রী বা এয়ারলাইন্স বাড়বে না।
এর জন্য যাত্রী চাহিদা, উপযোগী সময়সূচি, প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া এবং এয়ারলাইন্সের জন্য বাণিজ্যিকভাবে টেকসই পরিবেশও প্রয়োজন।
বরিশালের ব্যবসা, চিকিৎসা, পর্যটন ও সামগ্রিক আঞ্চলিক অর্থনীতিতে বিমানবন্দরটির সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে তাই অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা, নিয়মিত ফ্লাইট এবং যাত্রী চাহিদা—চারটি বিষয়কেই একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।
বর্তমান বাস্তবতায় বরিশাল বিমানবন্দরের বড় চ্যালেঞ্জ শুধু আধুনিক হওয়া নয়; আধুনিক বিমানবন্দরটিকে পর্যাপ্ত যাত্রী ও নিয়মিত ফ্লাইটের মাধ্যমে কার্যকরভাবে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা।
সূত্র: বরিশাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ