
এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিনিধি
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো বিভাগে কর্মরত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তা মো. মঈনউদ্দীন লোটাসকে কার্গো থেকে সরিয়ে মতিঝিলের জেলা বিক্রয় কার্যালয়ে (ডিএসও) পদায়ন করা হয়েছে।
রোববার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রশাসন শাখা থেকে জারি করা বদলি/প্রেষণ আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। আদেশে মঈনউদ্দীন লোটাসকে সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদেশ অনুযায়ী, তিনি ৭ সেপ্টেম্বর অপরাহ্ণে বর্তমান কর্মস্থল থেকে ‘স্ট্যান্ড রিলিজ’ হয়ে ৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেবেন।
মঈনউদ্দীন লোটাসের বিরুদ্ধে এর আগে বিমানবন্দরের কার্গো কার্যক্রম ঘিরে চাঁদাবাজি, কথিত ‘রোস্টার বাণিজ্য’ এবং পণ্য খালাসে অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের বরাতেও তার নামসহ কার্গোর একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।
তবে বিমানের সর্বশেষ বদলি আদেশে এসব অভিযোগের কারণে তাকে বদলি করা হয়েছে—এমন কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। একইভাবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি।
বিমানবন্দরের কার্গো সেক্টরের বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে এর আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে একটি গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে মঈনউদ্দীন লোটাসসহ একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম উল্লেখ করা হয়।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবেদনে অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্যত্র বদলি এবং অভিযোগ যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল।
অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল আমদানি কার্গো এলাকায় কথিত ‘রোস্টার বাণিজ্য’।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, আমদানি কার্গো সেকশনের নির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পাওয়ার জন্য কিছু হেলপারের কাছ থেকে মাসিক ভিত্তিতে অর্থ নেওয়া হতো।
অভিযোগ অনুযায়ী, মাসে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থের বিনিময়ে পছন্দের জায়গায় ডিউটি বা রোস্টারে নাম অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ দেওয়া হতো।
তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয় এবং সংশ্লিষ্ট তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফলও প্রকাশ্যে আসেনি।
মঈনউদ্দীন লোটাস এর আগে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তিনি জড়িত নন এবং তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ ভিত্তিহীন।
ফলে অভিযোগের বিষয়ে তার অবস্থানও এই ঘটনার মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে কোনো অনিয়মের জন্য দায়ী হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই।
কার্গো ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের উদাহরণ হিসেবে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে একটি বড় পণ্য খালাসের ঘটনার কথাও উঠে আসে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চীন থেকে আমদানি করা প্রায় ৪ হাজার ২৩৭ কেজি ফেব্রিকস ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে এবং যথাযথ বিল অব এন্ট্রি ও কাস্টমস শুল্কায়ন ছাড়াই কার্গো এলাকা থেকে বের করে নেওয়ার অভিযোগ করা হয়।
এ ঘটনায় বিমান ও কাস্টমসের কিছু অসাধু ব্যক্তির সম্ভাব্য যোগসাজশের অভিযোগও প্রতিবেদনে উঠে আসে বলে প্রকাশিত সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এ অভিযোগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
কার্গো সেক্টরে এসব অভিযোগ সামনে আসার পর কর্মীদের রোস্টার ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা আনার দাবি ওঠে।
বিশেষ করে ম্যানুয়াল পদ্ধতির পরিবর্তে অটোমেটেড রোস্টার ব্যবস্থা চালু করা হলে একই ব্যক্তি দীর্ঘ সময় নির্দিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ কমানো এবং দায়িত্ব বণ্টনের তথ্য সংরক্ষণ সহজ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের মত।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিন একই সংবেদনশীল দায়িত্বে থাকা কর্মীদের পর্যায়ক্রমিক বদলি এবং যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়ে যথাযথ তদন্তের সুপারিশও সামনে আসে।
বিমান প্রশাসনের সর্বশেষ আদেশে মঈনউদ্দীন লোটাসকে কার্গো বিভাগ থেকে সরিয়ে মতিঝিলের ডিএসওতে পদায়ন করা হয়েছে। ফলে তিনি আর শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো বিভাগে আগের দায়িত্বে থাকছেন না।
তবে একটি প্রশাসনিক বদলি কোনো অভিযোগ প্রমাণ বা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি—কোনোটিই নির্দেশ করে না।
এর আগে কার্গো সেক্টরের অভিযোগ নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, গোয়েন্দা প্রতিবেদন গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং বিমানের নিজস্ব সিকিউরিটি বিভাগ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছিল।
এ অবস্থায় মঈনউদ্দীন লোটাসকে কার্গো থেকে সরানোর পর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে—কার্গো ব্যবস্থাপনা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর তদন্ত শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছায় এবং অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সূত্র: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বদলি/প্রেষণ আদেশ, গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে প্রকাশিত তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য