
এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিনিধি
দুবাই, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবকেন্দ্রিক স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে সক্রিয় রয়েছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত সূত্রে।
অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে অবস্থানরত চক্রের সদস্যরা দেশের অভ্যন্তরে থাকা সহযোগীদের ব্যবহার করে উড়োজাহাজ থেকে স্বর্ণ সংগ্রহের পর বিমানবন্দরের নিরাপত্তাবলয় পেরিয়ে বাইরে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় বিমানসংশ্লিষ্ট কর্মীদের আটকের পর বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও কর্মীদের প্রবেশাধিকার নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিদেশে অবস্থানরত অন্তত অর্ধশত ব্যক্তি বিভিন্ন পর্যায়ে এই নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করছে। দেশে তাদের হয়ে দুই শতাধিক মাঝারি পর্যায়ের চোরাকারবারি কাজ করছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে এই সংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় নিয়ে তদন্ত চলমান থাকায় স্বাধীনভাবে সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সর্বশেষ দুবাই–চট্টগ্রাম–ঢাকা রুটের বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-১৪৮ ফ্লাইট থেকে ১২০টি স্বর্ণের বার উদ্ধারের ঘটনায় বিমানের অ্যাসিস্ট্যান্ট টেকনিক্যাল হেলপার মো. সোয়েব গাজীকে আটক করা হয়।
কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, তার পরিহিত বেল্টের ভেতরে কালো স্কচটেপ দিয়ে মোড়ানো অবস্থায় ১৩ দশমিক ৯২ কেজি স্বর্ণ পাওয়া যায়। জব্দ করা স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
ঘটনার পর সোয়েবকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে সোয়েব গত ছয় মাসে অন্তত পাঁচটি স্বর্ণের চালান বিমান থেকে বাইরে পৌঁছে দেওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছেন।
সূত্র অনুযায়ী, তার ভাষ্য হচ্ছে—তিনি স্বর্ণের প্রকৃত মালিকদের চিনতেন না। উড়োজাহাজের ভেতরে নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে চালান নিয়ে বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষমাণ ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে কমিশন পেতেন।
তবে জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া বক্তব্য তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাচাইসাপেক্ষ।
তদন্তকারীরা এখন সোয়েব একাই কাজ করতেন, নাকি বিমানবন্দরের ভেতরে আরও সহযোগী ছিলেন—সেটি খতিয়ে দেখছেন।
বিমানবন্দরসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তদন্তে বিমানের প্রকৌশল বিভাগের কয়েকজন কর্মীর নামও আলোচনায় এসেছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও অন্যান্য বিভাগের কয়েকজন কর্মীর সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার অভিযোগও যাচাই করা হচ্ছে।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব ব্যক্তিকে স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত হিসেবে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুল হাসান তালুকদার জানিয়েছেন, শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনায় বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। সর্বশেষ আটক সোয়েবকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও আরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
ঢাকা কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার কামরুল হাসান জানিয়েছেন, বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে স্বর্ণ চোরাচালানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকেন্দ্রিক স্বর্ণ চোরাচালানের মাত্রা বোঝা যায় সংশ্লিষ্ট সংস্থার পরিসংখ্যানেও।
বিমানবন্দর থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে স্বর্ণ চোরাচালানসংক্রান্ত ৫৫০টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে ৪৯০ জনকে।
অন্যদিকে ঢাকা কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে বিভিন্ন অভিযানে প্রায় ২ হাজার কেজি স্বর্ণ জব্দ হয়েছে। যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
অর্থবছরভিত্তিক হিসাবে—
২০২১-২২ অর্থবছরে ৬৯৭ কেজি
২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫৪ কেজি
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪১৭ কেজি
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৮ কেজি
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭৮ কেজির বেশি স্বর্ণ জব্দ হয়েছে।
এই হিসাব অনুযায়ী জব্দের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমেছে। তবে শুধু জব্দের পরিমাণ কমে যাওয়াকে চোরাচালান একই হারে কমে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। জব্দের পরিমাণ অভিযান, গোয়েন্দা তথ্য, চোরাচালানের কৌশল এবং নজরদারির কার্যকারিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে।
উড়োজাহাজের ভেতর থেকে স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা নতুন নয়।
এর আগে দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের কার্গো হোল থেকে ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।
আরেক ঘটনায় দুবাই থেকে আসা একটি উড়োজাহাজের টয়লেট প্যানেলের ভেতর থেকে ১৫৩টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়েছিল।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে আসা বাহকের মাধ্যমে স্বর্ণ উড়োজাহাজে প্রবেশ করানো হয়। পরে ঢাকায় কিংবা অভ্যন্তরীণ সেক্টরে চক্রের অন্য সদস্যরা সেটি সংগ্রহের চেষ্টা করেন।
কার্গো কম্পার্টমেন্ট, টয়লেট প্যানেল কিংবা কর্মীদের ব্যবহৃত সামগ্রীর মতো স্থান ব্যবহার করে স্বর্ণ পাচারের ঘটনা বিমানবন্দরের প্রচলিত যাত্রীকেন্দ্রিক তল্লাশির বাইরে একটি ভিন্ন নিরাপত্তা ঝুঁকির দিক সামনে আনছে।
বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা ও রাজস্ব সংস্থার অভিযানে উদ্ধার করা স্বর্ণ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা রাখা হয়।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মামলার আলামত হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে থাকা স্বর্ণের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৯৩০ কেজি।
এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ১১১ কেজি স্বর্ণের বার এবং প্রায় ৮১৯ কেজি স্বর্ণালঙ্কার।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জব্দ করা স্বর্ণ নিলামের মাধ্যমে বিক্রির প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ বছরের পর বছর ভল্টে সংরক্ষিত রয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিমানবন্দরের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনছে—শুধু যাত্রী ও ব্যাগেজ তল্লাশি জোরদার করলেই কি স্বর্ণ চোরাচালান ঠেকানো সম্ভব?
বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বৈধভাবে প্রবেশ করতে পারেন এমন অনেক কর্মীকে দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনে উড়োজাহাজের কাছাকাছি কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে উড়োজাহাজের ভেতরেও যেতে হয়।
ফলে সংশ্লিষ্টদের মতে, ঝুঁকি মোকাবিলায় কর্মীদের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, এয়ারসাইড মুভমেন্ট পর্যবেক্ষণ, কার্গো ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমের নজরদারি এবং সন্দেহজনক আচরণ শনাক্তের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই পুরো বিভাগ বা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের দায়ী না করে নির্দিষ্ট ঘটনার তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত পরিচালনা করা প্রয়োজন।
বিমানবন্দরে স্বর্ণ বহনকারী বা চালান গ্রহণকারী ব্যক্তিকে আটক করা গেলেও এর পেছনের অর্থায়নকারী, বিদেশে অবস্থানরত নিয়ন্ত্রক এবং দেশের ভেতরের ক্রেতা ও বিতরণ নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা বড় চ্যালেঞ্জ।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, চোরাচালান দমনে তাই শুধু বিমানবন্দরে একটি চালান আটকের মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে বিদেশি উৎস থেকে দেশের অভ্যন্তরের গ্রহণকারী পর্যন্ত পুরো নেটওয়ার্কের আর্থিক ও যোগাযোগের যোগসূত্র শনাক্ত করা প্রয়োজন।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতো দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাস্টমস, পুলিশ, এভিয়েশন নিরাপত্তাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত নজরদারির পাশাপাশি বিমানবন্দরে বিশেষ প্রবেশাধিকার থাকা কর্মীদের ক্ষেত্রেও কার্যকর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: বিমানবন্দর থানা, ঢাকা কাস্টমস, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র