
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (MIA) অবতরণের পর রানওয়ে ছাড়িয়ে অ্যামাজনের পণ্য পরিবহনকারী একটি বোয়িং ৭৬৭ কার্গো উড়োজাহাজ ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এতে অন্তত পাঁচজন নিহত এবং আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় নিহত পাঁচজনই উড়োজাহাজের বাইরে বিভিন্ন যানবাহনে ছিলেন বলে পরবর্তী তদন্তে নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের National Transportation Safety Board (NTSB)।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় দুপুর ২টার কিছু আগে দুর্ঘটনাটি ঘটে। উড়োজাহাজটি অ্যামাজন এয়ারের হয়ে 21 Air Flight 7598 হিসেবে পরিচালিত হচ্ছিল। Boeing 767-300 কার্গো উড়োজাহাজটি পুয়ের্তো রিকোর সান হুয়ানের Luis Muñoz Marín International Airport থেকে মায়ামিতে এসেছিল।
FAA ও NTSB-এর তথ্য অনুযায়ী, মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের Runway 30-এ অবতরণের পর উড়োজাহাজটি নির্ধারিত রানওয়ের মধ্যে থামতে পারেনি। এটি রানওয়ের শেষ প্রান্ত অতিক্রম করে প্রায় ১ হাজার ৩০০ ফুট সামনে চলে যায়।
এ সময় উড়োজাহাজটি নেভিগেশন সরঞ্জাম ও বিমানবন্দরের সীমানার বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত করার পাশাপাশি একাধিক যানবাহনে ধাক্কা দেয়। পরে উড়োজাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং ঘটনাস্থল থেকে ঘন কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।
দুর্ঘটনার পর দ্রুত বড় ধরনের উদ্ধার অভিযান শুরু করে Miami-Dade Fire Rescue। ৬০টির বেশি ইউনিট এবং প্রায় ২০০ উদ্ধারকর্মী ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়।
দুর্ঘটনার প্রাথমিক প্রতিবেদনে হতাহতদের অবস্থান স্পষ্ট না থাকলেও NTSB-এর পরবর্তী তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় নিহত পাঁচজনই উড়োজাহাজের বাইরে থাকা যানবাহনে ছিলেন। উড়োজাহাজটি প্রথমে বিমানবন্দরের ভেতরে থাকা একটি Ford Econoline ভ্যানে আঘাত করে। ওই ভ্যানে একটি বিমান পরিষেবা প্রতিষ্ঠানের সাতজন কর্মী ছিলেন। এরপর বিমানবন্দরের perimeter fence ভেঙে Northwest 67th Avenue-এ থাকা একটি Toyota Corolla Cross-এ আঘাত করে।
সব মিলিয়ে ঘটনায় পাঁচজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হন। দুর্ঘটনার দিন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর ছিল।
উড়োজাহাজে শুধু দুইজন পাইলট ছিলেন। দুর্ঘটনার পর তারা ককপিটে আটকা পড়লেও উদ্ধারকারীরা তাদের বের করে আনেন।
দুর্ঘটনাকবলিত উড়োজাহাজটি Amazon Air বা Prime Air-এর পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হলেও এটি সরাসরি অ্যামাজন পরিচালনা করছিল না।
ফ্লাইটটি পরিচালনা করছিল মার্কিন কার্গো এয়ারলাইন 21 Air LLC। NTSB উড়োজাহাজটিকে Boeing 767-33A হিসেবে শনাক্ত করেছে। এটি ১৯৯৪ সালে তৈরি হয়েছিল এবং পরে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ থেকে কার্গো বিমানে রূপান্তর করা হয়।
দুর্ঘটনার দিন এটি একাধিক সেক্টরে কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা করেছিল। সান হুয়ান থেকে মায়ামিতে ফেরার সময়ই দুর্ঘটনাটি ঘটে।
দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তার কারণে মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ground stop জারি করা হয়। ফলে সাময়িকভাবে উড়োজাহাজের উড্ডয়ন ও অবতরণ বন্ধ হয়ে যায়।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরও উড়োজাহাজ থেকে জ্বালানি লিকের পরিস্থিতি মোকাবিলা করছিল উদ্ধারকারী দল। দুর্ঘটনার প্রভাবে ওই দিন মায়ামিতে শত শত ফ্লাইট বিলম্বিত হয়।
পরবর্তী সময়ে বিমানবন্দরের অন্য রানওয়েগুলো দিয়ে পর্যায়ক্রমে ফ্লাইট কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা হয়।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে NTSB। সংস্থাটি দুর্ঘটনাস্থল থেকে উড়োজাহাজটির Cockpit Voice Recorder (CVR) এবং Flight Data Recorder (FDR) উদ্ধার করে ওয়াশিংটনে পরীক্ষাগারে নিয়ে গেছে।
NTSB জানিয়েছে, CVR থেকে দুই ঘণ্টার বেশি ভালো মানের অডিও পাওয়া গেছে। অন্যদিকে FDR-এ প্রায় ৫৪ ঘণ্টার তথ্য এবং ৪০০টির বেশি flight parameter রেকর্ড ছিল।
এই তথ্যের মাধ্যমে অবতরণের সময় উড়োজাহাজের গতি, পাইলটদের নিয়ন্ত্রণ ইনপুট, ব্রেকিং, ইঞ্জিনের অবস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশ্লেষণ করছেন তদন্তকারীরা।
NTSB-এর প্রাথমিক ফ্লাইট ডাটা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উড়োজাহাজটি রানওয়ে ছাড়িয়ে যাওয়ার পরও উল্লেখযোগ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল।
তদন্তকারীদের প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্যে বলা হয়েছে, রেকর্ডিংয়ের শেষ পর্যায়ে ব্রেক প্রয়োগ করা ছিল এবং থ্রটল idle অবস্থায় ছিল। তবে রেকর্ড করা ডাটায় speed brake বা thrust reverser মোতায়েনের কোনো indication পাওয়া যায়নি।
এ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও NTSB এখনো দুর্ঘটনার চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণ করেনি। কোনো সিস্টেম কেন সক্রিয় হয়নি, পাইলটরা কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কিংবা আবহাওয়া ও রানওয়ের পরিস্থিতি কতটা ভূমিকা রেখেছিল—এসব বিষয় পূর্ণাঙ্গ তদন্তের অংশ।
পরবর্তী প্রাথমিক তদন্তে ফ্লাইটটির approach ও landing sequence নিয়েও তথ্য পাওয়া গেছে। ফ্লাইট ডাটা ও ককপিট রেকর্ডিংয়ের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা অবতরণের শেষ পর্যায়ে পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য go-around বা অবতরণ বাতিলের সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করছেন।
তবে তদন্ত চলমান থাকায় এখনই পাইলটের ভুল, যান্ত্রিক ত্রুটি, আবহাওয়া বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট বিষয়কে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
একটি runway overrun-এর তদন্তে সাধারণত approach stability, touchdown point ও speed, runway condition, braking performance, thrust reverser, আবহাওয়া, air traffic control এবং crew decision-making-সহ একাধিক বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়।
Runway overrun বলতে অবতরণ বা উড্ডয়নের সময় কোনো উড়োজাহাজ রানওয়ের নির্ধারিত শেষ প্রান্তের মধ্যে থামতে না পেরে বাইরে চলে যাওয়াকে বোঝায়।
বড় কার্গো উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে অবতরণের গতি ও ওজন বেশি হওয়ায় রানওয়ে ছাড়িয়ে গেলে পরিণতি গুরুতর হতে পারে। মায়ামির ঘটনায় উড়োজাহাজটি বিমানবন্দরের সীমানা অতিক্রম করে স্থলযানে আঘাত করায় দুর্ঘটনাটি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
NTSB-এর তদন্ত এখনো চলমান। সংস্থাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের আগে দুর্ঘটনার নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যথাযথ হবে না।
অ্যামাজন জানিয়েছে, নিহতদের পরিবার ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি তারা সমবেদনা জানিয়েছে এবং তদন্তে NTSB ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করছে।
সূত্র: NTSB, FAA, Reuters, AP ও Miami-Dade কর্তৃপক্ষ