
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার ইনচিওন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১ প্রায় আড়াই দশক পর বড় ধরনের সংস্কারের মধ্য দিয়ে যেতে যাচ্ছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে পুরো প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে টার্মিনালটির পুরোনো অবকাঠামো ও যাত্রীসেবা ব্যবস্থা আধুনিকায়নে ১.৭৭ ট্রিলিয়ন ওনের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে Incheon International Airport Corporation (IIAC)।
২০০১ সালে ইনচিওন বিমানবন্দরের সঙ্গে যাত্রা শুরু করা টার্মিনাল-১-এর যান্ত্রিক, বৈদ্যুতিক, টেলিযোগাযোগ ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নতুন করে সাজানো হবে। একই সঙ্গে ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং যাত্রী চলাচলের বিন্যাসেও বড় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটির নকশা ও প্রস্তুতিমূলক কাজ ইতোমধ্যে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। IIAC-এর পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিস্তারিত নকশা সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর ২০২৮ সালে মূল নির্মাণ ও সংস্কারকাজ শুরু হবে।
পুরো প্রকল্প শেষ হতে সময় লাগবে প্রায় সাত বছর। লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে টার্মিনাল-১-এর সংস্কার সম্পন্ন হবে।
দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, সংস্কারের পুরো সময়েও বিমানবন্দরটির স্বাভাবিক কার্যক্রম যতটা সম্ভব চালু রাখতে চায় কর্তৃপক্ষ।
ইনচিওন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ২০০১ সালের মার্চে চালু হয়। সেই সময় থেকেই টার্মিনাল-১ বিমানবন্দরটির প্রধান যাত্রী টার্মিনাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে টার্মিনালটির অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা এখন বড় ধরনের আধুনিকায়নের পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রকল্পের আওতায় mechanical, electrical, telecommunications এবং fire-safety systems নতুন প্রযুক্তি ও বর্তমান নিরাপত্তা মান অনুযায়ী উন্নত করা হবে।
এ ধরনের সংস্কার দৃশ্যমান টার্মিনাল ভবনের পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বিদ্যুৎ সরবরাহ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, অগ্নিনিরাপত্তা, যোগাযোগ এবং যাত্রী ও ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনার মতো ‘ব্যাক-অফ-হাউস’ অবকাঠামো বিমানবন্দরের নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টার্মিনাল-১-এর Baggage Handling System (BHS)-ও প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে আধুনিকায়ন করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যাগেজ নিরাপত্তা পরীক্ষার বিদ্যমান ব্যবস্থা পরিবর্তন করে ১০০ শতাংশ ব্যাগেজ স্ক্রিনিং সক্ষমতা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আধুনিক বিমানবন্দরে ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম শুধু লাগেজ পরিবহনের conveyor belt নয়। চেক-ইন কাউন্টার থেকে ব্যাগ গ্রহণ, নিরাপত্তা পরীক্ষা, স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট ফ্লাইট অনুযায়ী sorting এবং শেষে উড়োজাহাজে পাঠানো—পুরো প্রক্রিয়াটি এর সঙ্গে যুক্ত।
ফলে নতুন BHS টার্মিনালের নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাগেজ প্রক্রিয়াকরণে গতি ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখবে।
সংস্কারের পর টার্মিনাল-১-এর যাত্রী চলাচলের বিন্যাসেও বড় পরিবর্তন দেখা যাবে।
বর্তমানে পৃথকভাবে থাকা ছয়টি departure ও arrival hall পুনর্বিন্যাস করে আরও সমন্বিত যাত্রীপ্রবাহ ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে duty-free ও অন্যান্য বাণিজ্যিক এলাকার বিন্যাস পরিবর্তন করা হবে। লক্ষ্য হচ্ছে যাত্রীদের চেক-ইন, নিরাপত্তা পরীক্ষা, ইমিগ্রেশন এবং বোর্ডিংয়ের মধ্যে চলাচল আরও সহজ করা।
আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন interior layout ব্যবহার করে টার্মিনালের বিভিন্ন অংশে যাত্রীজট কমানোর বিষয়টিও পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হচ্ছে টার্মিনাল-১ পুরোপুরি বন্ধ না করেই সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা।
এ কারণে টার্মিনালকে কয়েকটি জোনে ভাগ করে পর্যায়ক্রমে কাজ করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একটি অংশে নির্মাণ চলাকালে অন্য অংশগুলো দিয়ে যাত্রীসেবা চালু রাখা হবে।
তবে IIAC বিকল্প ব্যবস্থাও বিবেচনা করছে। বিমানবন্দরের খালি জায়গায় অস্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণ করা হলে যাত্রী কার্যক্রম সাময়িকভাবে সেখানে স্থানান্তর করে টার্মিনাল-১-এর বড় অংশ একসঙ্গে সংস্কার করা সম্ভব হতে পারে।
কোন পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর হবে, তা বিস্তারিত নকশা ও অপারেশনাল মূল্যায়নের মাধ্যমে চূড়ান্ত হওয়ার কথা।
সংস্কার প্রকল্প শেষ হলে টার্মিনাল-১-এর বার্ষিক যাত্রী পরিচালন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
বর্তমানে টার্মিনালটির পরিকল্পিত বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ৫৪ মিলিয়ন বা ৫ কোটি ৪০ লাখ যাত্রী। আধুনিকায়নের পর তা বেড়ে প্রায় ৬৪ মিলিয়ন বা ৬ কোটি ৪০ লাখে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে।
অর্থাৎ শুধু সংস্কারের মাধ্যমেই টার্মিনালটি বছরে অতিরিক্ত প্রায় এক কোটি যাত্রী পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করবে।
নতুন টার্মিনাল নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান অবকাঠামোর বিন্যাস, প্রযুক্তি ও passenger-processing efficiency উন্নত করে অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরির চেষ্টা করছে IIAC।
ইনচিওন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমানে দুটি প্রধান যাত্রী টার্মিনাল রয়েছে।
টার্মিনাল-১ থেকে Vietnam Airlines, VietJet Air, Jeju Air, Japan Airlines, Singapore Airlines ও Emirates-সহ বহু আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন ফ্লাইট পরিচালনা করে।
অন্যদিকে টার্মিনাল-২ মূলত Korean Air ও সংশ্লিষ্ট SkyTeam এয়ারলাইনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে Asiana Airlines-এর কার্যক্রমও টার্মিনাল-২-এ স্থানান্তরিত হয়েছে।
এই স্থানান্তর টার্মিনাল-১ সংস্কারের ক্ষেত্রেও অপারেশনাল সুবিধা তৈরি করতে পারে, কারণ দীর্ঘমেয়াদি নির্মাণকাজের সময় বিমানবন্দরের যাত্রী ও ফ্লাইট কার্যক্রম দুই টার্মিনালের মধ্যে আরও কার্যকরভাবে বণ্টনের সুযোগ থাকবে।
টার্মিনাল আধুনিকায়নের পরিকল্পনা এমন সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন ইনচিওন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচলও বাড়ছে।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিমানবন্দরটি দিয়ে প্রায় ৩৮.৩৯ মিলিয়ন আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচল করেছেন। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি প্রায় ৬.৩ শতাংশ বেশি।
এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আগামী দশকে বিদ্যমান টার্মিনাল অবকাঠামোর ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। ফলে টার্মিনাল-১-এর সক্ষমতা ১০ মিলিয়ন যাত্রী বাড়ানোর পরিকল্পনাটি শুধু অবকাঠামো সংস্কার নয়, ভবিষ্যতের যাত্রী চাহিদা সামাল দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিরও অংশ।
যাত্রীসেবা ও বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় ইনচিওন দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের শীর্ষ বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে অবস্থান করছে। Skytrax World Airport Awards 2026-এ ইনচিওন বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা বিমানবন্দর হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের প্রধান আন্তর্জাতিক গেটওয়ে হওয়ার পাশাপাশি ইনচিওন পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকেন্দ্র।
ফলে টার্মিনাল-১-এর আধুনিকায়ন শুধু অতিরিক্ত যাত্রী পরিচালনার জন্য নয়; এশিয়ার অন্যান্য বড় আন্তর্জাতিক হাবের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ইনচিওনের অবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রায় ২৫ বছর আগে নির্মিত টার্মিনালটির মূল অবকাঠামো প্রতিস্থাপন, শতভাগ ব্যাগেজ স্ক্রিনিং, উন্নত যাত্রীপ্রবাহ এবং বছরে অতিরিক্ত এক কোটি যাত্রী পরিচালনার সক্ষমতা—সব মিলিয়ে ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রকল্পটি ইনচিওন বিমানবন্দরের অন্যতম বড় অবকাঠামোগত রূপান্তর হতে যাচ্ছে।
সূত্র: Incheon International Airport Corporation (IIAC)