
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
প্রায় আট বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আবারও বিদেশি এয়ারলাইন্সের নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শুরু হয়েছে। ওমানের স্বল্পমূল্যের এয়ারলাইন সালামএয়ার মাস্কাট–সিলেট–মাস্কাট রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালু করেছে। নতুন রুটে সপ্তাহে তিন দিন ফ্লাইট পরিচালনা করছে এয়ারলাইন্সটি।
গত ১ সেপ্টেম্বর মাস্কাট থেকে সালামএয়ারের উদ্বোধনী ফ্লাইট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। প্রথম ফ্লাইটে সিলেটে আসেন ১৩৩ জন যাত্রী। বিমানবন্দরে উড়োজাহাজটিকে ঐতিহ্যবাহী ওয়াটার ক্যানন স্যালুট দিয়ে স্বাগত জানানো হয়।
পরে একই উড়োজাহাজ ২২৪ জন যাত্রী নিয়ে সিলেট থেকে মাস্কাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।
সালামএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, উদ্বোধনী ফ্লাইটটি মাস্কাট থেকে প্রায় ৭০ শতাংশ লোড ফ্যাক্টর নিয়ে সিলেটে আসে। নতুন রুট চালুর মাধ্যমে সিলেট বাংলাদেশে সালামএয়ারের তৃতীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জন্য সালামএয়ারের নতুন রুটের গুরুত্ব শুধু আরেকটি আন্তর্জাতিক গন্তব্য যুক্ত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাধ্যমে প্রায় আট বছর পর বিমানবন্দরটিতে কোনো বিদেশি এয়ারলাইন্সের নিয়মিত ফ্লাইট ফিরে এসেছে।
এর আগে দুবাইভিত্তিক ফ্লাইদুবাই ২০১৫ সালের এপ্রিলে সিলেট থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শুরু করেছিল। যাত্রীচাহিদা বাড়ার পর একসময় দৈনিক ফ্লাইটও পরিচালনা করে এয়ারলাইন্সটি।
তবে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ফ্লাইদুবাই সিলেটের কার্যক্রম বন্ধ করে দিলে দীর্ঘ সময় ওসমানী বিমানবন্দর থেকে কোনো বিদেশি এয়ারলাইন্সের নিয়মিত ফ্লাইট ছিল না।
সালামএয়ারের আগমনের মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ বিরতির অবসান হলো।
সালামএয়ারের প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার, বৃহস্পতিবার ও শনিবার সিলেট–মাস্কাট রুটে ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে।
OV421 ফ্লাইট মাস্কাট থেকে সিলেটে এবং OV422 সিলেট থেকে মাস্কাটে পরিচালিত হচ্ছে। রুটটিতে Airbus A321neo ব্যবহারের পরিকল্পনার তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে।
সিলেট থেকে মাস্কাটের সরাসরি ফ্লাইটের সময় প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। দুই শহরের আকাশপথের দূরত্ব প্রায় ৩ হাজার ৪১৮ কিলোমিটার।
সালামএয়ার ভবিষ্যতে এ রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও জানিয়েছে। উদ্বোধনের সময় এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রয়োজনীয় অনুমোদন সাপেক্ষে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে দৈনিক ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এটি এখনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা; চূড়ান্ত ফ্লাইট সূচি হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই।
সিলেট অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বসবাস ও কর্মরত। তাদের একটি অংশ ওমানে থাকেন। সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় এতদিন অনেক যাত্রীকে ঢাকা বা অন্য বিমানবন্দর ব্যবহার করে যাতায়াত করতে হতো।
সরাসরি সিলেট–মাস্কাট ফ্লাইট চালু হওয়ায় বৃহত্তর সিলেটের ওমানপ্রবাসী এবং তাদের পরিবারের জন্য যাত্রা সহজ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ঢাকা হয়ে যাতায়াতের প্রয়োজন কমলে অভ্যন্তরীণ যাত্রার সময় ও সংশ্লিষ্ট ভোগান্তিও কমতে পারে।
তবে নতুন রুটটি দীর্ঘমেয়াদে কতটা বাণিজ্যিকভাবে সফল হবে, তা নির্ভর করবে নিয়মিত যাত্রীচাহিদা, টিকিটের মূল্য, ফ্লাইটের সময়সূচি এবং সেবার ধারাবাহিকতার ওপর।
নতুন রুটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে কানেক্টিং যাত্রীর সম্ভাবনা।
মাস্কাট সালামএয়ারের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্র হওয়ায় সিলেট থেকে মাস্কাটে পৌঁছে এয়ারলাইন্সটির অন্যান্য গন্তব্যে সংযোগ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এয়ারলাইন্সটি জানিয়েছে, সিলেট রুটের যাত্রীরা মাস্কাটের পাশাপাশি সালালাহ থেকেও মাস্কাট হয়ে সুবিধাজনক সংযোগ নিতে পারবেন।
তবে কানেক্টিং ফ্লাইটের ক্ষেত্রে যাত্রীদের টিকিট একই বুকিংয়ে রয়েছে কি না, ব্যাগেজ চূড়ান্ত গন্তব্য পর্যন্ত পাঠানোর সুবিধা রয়েছে কি না, ট্রানজিটের শর্ত এবং সংযোগের সময় আগেই যাচাই করা প্রয়োজন।
সিলেটে ফ্লাইট চালুর আগে সালামএয়ার ঢাকা ও চট্টগ্রামে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছিল।
এয়ারলাইন্সটির প্রকাশিত সেপ্টেম্বরের সূচিতে ঢাকা–মাস্কাট দৈনিক এবং চট্টগ্রাম–মাস্কাট দিনে দুইবার পর্যন্ত ফ্লাইট পরিচালনার তথ্য রয়েছে।
সিলেট যুক্ত হওয়ার ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট—বাংলাদেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই নির্ধারিত যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনাকারী বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর একটি হয়ে উঠেছে সালামএয়ার।
আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহন শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক না থেকে সিলেট ও চট্টগ্রামের মতো আঞ্চলিক বিমানবন্দরে সম্প্রসারিত হলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের যাত্রীদের সরাসরি বিদেশযাত্রার সুযোগ বাড়তে পারে।
সালামএয়ার সিলেট থেকে যাত্রাকারীদের ভোর ৪টার মধ্যে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পরামর্শ দিয়েছে, যাতে চেক-ইন, ইমিগ্রেশন ও অন্যান্য প্রি-ফ্লাইট আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকে।
একই সঙ্গে যাত্রার আগে সর্বশেষ ফ্লাইট সূচি যাচাই করা প্রয়োজন। অপারেশনাল কিংবা নিয়ন্ত্রক কারণে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন হতে পারে।
ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক হাফিজ আহমেদ এর আগে জানিয়েছিলেন, সালামএয়ারের পাশাপাশি আরও কয়েকটি বিদেশি এয়ারলাইন্স সিলেট থেকে ফ্লাইট পরিচালনায় আগ্রহ দেখিয়েছে।
প্রকাশিত তথ্যে ফ্লাইদুবাইয়ের পুনরায় সিলেটে আসার আগ্রহ এবং এয়ার অ্যারাবিয়ার সম্ভাব্য কার্যক্রমের কথাও উঠে এসেছে।
তবে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোর চূড়ান্ত ঘোষণা এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত এসব সম্ভাব্য ফ্লাইটকে নিশ্চিত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
সালামএয়ারের সিলেট রুটটি যদি যাত্রীচাহিদা ধরে রেখে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয়, তাহলে এটি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আরও বিদেশি এয়ারলাইন্স আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক উদাহরণ হতে পারে।
সব মিলিয়ে আট বছর পর বিদেশি এয়ারলাইন্সের নিয়মিত ফ্লাইট ফিরে আসা সিলেটের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ওমানপ্রবাসীদের সরাসরি যাতায়াতের সুবিধার পাশাপাশি এটি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও সরাসরি যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করেছে।
সূত্র: সালামএয়ারের আনুষ্ঠানিক তথ্য ও ফ্লাইট সূচি, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট এভিয়েশন তথ্য