
এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিনিধি
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় এক দশক ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা চার বেসরকারি এয়ারলাইন্সের ১২টি উড়োজাহাজ সরানোর উদ্যোগ নতুন জটিলতায় পড়েছে। তিন এয়ারলাইন্সের কাছেই বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পাওনা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ২৫৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। অথচ বিপুল অঙ্কের বকেয়ার পাশাপাশি পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দরের মূল্যবান অ্যাপ্রোন এলাকা দখল করে আছে।
এ অবস্থায় ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে উড়োজাহাজগুলো বিক্রির অনুমোদন চেয়েছিল বেবিচক। তবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ওই প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়নি।
মন্ত্রণালয় উড়োজাহাজগুলোর ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করে প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ দ্রুত সরানোর প্রক্রিয়া আপাতত আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পড়ে থাকা ১২টি উড়োজাহাজের মধ্যে United Airways-এর আটটি, Regent Airways-এর দুটি এবং GMG Airlines ও Aviana Airlines-এর একটি করে রয়েছে।
একসময় যাত্রী পরিবহন করা এসব উড়োজাহাজ বছরের পর বছর বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোন এলাকায় পড়ে আছে।
দীর্ঘদিন খোলা আকাশের নিচে থাকায় উড়োজাহাজগুলোর অধিকাংশের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়েছে। অনেক অংশে মরিচা ধরেছে। ফলে এগুলো আবার নিয়মিত যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ হিসেবে ব্যবহার করার পরিবর্তে স্ক্র্যাপ কিংবা পুনর্ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ হিসেবে বিক্রির বিষয়টি বিবেচনায় নেয় বেবিচক।
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সারচার্জসহ Regent Airways-এর কাছে ৪৫৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে।
এ ছাড়া GMG Airlines-এর কাছে ৪১১ কোটি ৮১ লাখ টাকা এবং United Airways-এর কাছে ৩৯১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে বেবিচকের।
এই তিন প্রতিষ্ঠানের বকেয়া যোগ করলে দাঁড়ায়—
৪৫৪.৬১ + ৪১১.৮১ + ৩৯১.৩৪ = ১,২৫৭.৭৬ কোটি টাকা।
অর্থাৎ শুধু তিনটি বন্ধ বা অকার্যকর এয়ারলাইন্সের কাছেই বেবিচকের পাওনা প্রায় ১ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা।
এ ছাড়া Aviana Airlines-এর কাছেও বেবিচকের অর্থ পাওনা রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির বকেয়ার সুনির্দিষ্ট পরিমাণ সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়নি।
দীর্ঘদিন পড়ে থেকে উড়োজাহাজগুলোর অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হওয়ায় এগুলো দ্রুত সরানোর উদ্যোগ নেয় বেবিচক।
উড়োজাহাজগুলো কার্যত স্ক্র্যাপ ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রির অনুমোদন চেয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল।
কিন্তু বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সেই পদ্ধতিতে বিক্রির প্রস্তাব অনুমোদন করেনি।
বরং পরিত্যক্ত উড়োজাহাজগুলোর ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করে প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ফলে এখন উড়োজাহাজগুলোর মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরই বিক্রির পরবর্তী ধাপে যেতে হবে।
১২টি পরিত্যক্ত উড়োজাহাজের সমস্যা শুধু বিপুল অঙ্কের বকেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে এগুলো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোনের মূল্যবান জায়গাও দখল করে আছে।
একটি ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অ্যাপ্রোন স্পেস উড়োজাহাজ পার্কিং, গ্রাউন্ড অপারেশন এবং অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
বিশেষ করে শাহজালালে ফ্লাইট ও উড়োজাহাজ চলাচলের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিমানবন্দরের বিদ্যমান জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সেই প্রেক্ষাপটে প্রায় এক দশক ধরে অচল উড়োজাহাজের জায়গা দখল করে থাকা একটি অপারেশনাল সমস্যাও তৈরি করছে।
পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ দীর্ঘদিন খোলা পরিবেশে পড়ে থাকলে ধাতব কাঠামো, ইঞ্জিনের বিভিন্ন অংশ, এভিওনিকস ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে।
ফলে বিক্রির প্রক্রিয়া যত দীর্ঘ হবে, উড়োজাহাজগুলোর অবশিষ্ট বাণিজ্যিক মূল্যও তত কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যদিকে সরকারি সম্পদ বা জব্দ করা সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রে যথাযথ মূল্য নির্ধারণ ও প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ নির্দেশনার পর এখন মূল প্রশ্ন হচ্ছে—উড়োজাহাজগুলোর গ্রহণযোগ্য ভিত্তিমূল্য কীভাবে এবং কত দ্রুত নির্ধারণ করা হবে।
বিপুল বকেয়া, নষ্ট হয়ে যাওয়া উড়োজাহাজ এবং বিমানবন্দরের মূল্যবান জায়গা দখল—সব মিলিয়ে পরিত্যক্ত ১২ উড়োজাহাজ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দীর্ঘদিনের একটি অমীমাংসিত সমস্যা।
বেবিচক এগুলো আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে দ্রুত বিক্রি করে জায়গা খালি করতে চাইলেও ভিত্তিমূল্য ছাড়া বিক্রির প্রস্তাবে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় সেই প্রক্রিয়া এখন নতুন ধাপে প্রবেশ করেছে।
এখন ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ, প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ এবং পরবর্তী দরপত্র প্রক্রিয়া কত দ্রুত শেষ করা যায়, তার ওপর নির্ভর করবে প্রায় এক দশক ধরে শাহজালালে পড়ে থাকা ১২টি পরিত্যক্ত উড়োজাহাজ কবে সরানো সম্ভব হবে।
সূত্র: বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)