
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
আন্তর্জাতিক বিমান ভ্রমণে দ্রুত বদলে যাচ্ছে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও যাত্রী যাচাইয়ের পদ্ধতি। যুক্তরাজ্যে ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ETA) বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি ইউরোপের শেনজেন সীমান্তে পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে বায়োমেট্রিকনির্ভর Entry/Exit System (EES)। আর ২০২৬ সালের শেষ প্রান্তিকে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে European Travel Information and Authorisation System (ETIAS)। একই সময়ে বিশ্বের অন্যতম বড় এভিয়েশন হাব দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও স্থানীয় বা পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট এবং ট্রানজিট যাত্রীর মিশ্রণে পরিবর্তনের চিত্র দেখা যাচ্ছে।
এসব পরিবর্তন ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বিমান ভ্রমণে শুধু টিকিটের মূল্য বা ফ্লাইটের সময়সূচি নয়—ডিজিটাল ট্রাভেল অথরাইজেশন, ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা, ট্রানজিটের নিয়ম এবং বিমানবন্দরের সংযোগ সক্ষমতাও যাত্রীর রুট নির্বাচনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
যুক্তরাজ্য ধাপে ধাপে Electronic Travel Authorisation (ETA) ব্যবস্থা চালুর পর ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে সংশ্লিষ্ট নন-ভিসা ন্যাশনালদের জন্য ভ্রমণের আগে ডিজিটাল অনুমোদন কার্যকরভাবে বাধ্যতামূলক করেছে। যেসব ভ্রমণকারীর ETA প্রয়োজন, বৈধ অনুমোদন ছাড়া এয়ারলাইন তাদের বোর্ডিং করতে না-ও দিতে পারে।
তবে ETA কোনো ভিসা নয় এবং এটি সবার জন্যও প্রযোজ্য নয়। কার ETA বা ভিসা প্রয়োজন, তা জাতীয়তা ও ভ্রমণের উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে। বর্তমানে ETA পাসপোর্টের সঙ্গে ডিজিটালভাবে যুক্ত থাকে।
বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যের ভিসা-আবশ্যক দেশের তালিকায় রয়েছে। ফলে সাধারণ বাংলাদেশি ভ্রমণকারীর জন্য ETA যুক্তরাজ্যের ভিসার বিকল্প নয়; তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য UK visa ও transit visa-এর নিয়মই যাচাই করতে হবে।
ইউরোপের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আরও বড় পরিবর্তন এনেছে Entry/Exit System (EES)। ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর পর্যায়ক্রমে চালু হওয়ার পর ১০ এপ্রিল ২০২৬ থেকে ২৯টি ইউরোপীয় দেশের বহিঃসীমান্তে EES পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে।
এই ব্যবস্থায় স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণে আসা সংশ্লিষ্ট নন-EU নাগরিকদের পাসপোর্টে প্রচলিত স্ট্যাম্প দেওয়ার পরিবর্তে প্রবেশ ও বের হওয়ার তথ্য ডিজিটালভাবে রেকর্ড করা হচ্ছে।
ভ্রমণ নথির তথ্যের পাশাপাশি মুখের ছবি ও আঙুলের ছাপের মতো বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবস্থাটিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এর মাধ্যমে যাত্রীর প্রবেশ ও প্রস্থানের সময় এবং অনুমোদিত অবস্থানের সময়সীমাও ডিজিটালভাবে হিসাব করা সম্ভব হচ্ছে।
বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—EES কোনো নতুন ভিসা নয়। বৈধ শেনজেন ভিসার প্রয়োজনীয়তা থাকলে সেটি আগের মতোই থাকবে; EES মূলত সীমান্তে প্রবেশ ও প্রস্থানের রেকর্ডিং পদ্ধতিকে ডিজিটাল করছে।
EES এবং ETIAS এক বিষয় নয়। এই পার্থক্যটি ইউরোপগামী যাত্রীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ইউরোপীয় কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ETIAS ২০২৬ সালের শেষ প্রান্তিকে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, তবে এর সুনির্দিষ্ট কার্যকর তারিখ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
ETIAS মূলত শেনজেন অঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণে ভিসামুক্ত সুবিধা পাওয়া নির্দিষ্ট দেশের নাগরিকদের জন্য প্রি-ট্রাভেল অথরাইজেশন ব্যবস্থা। ফলে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের প্রচলিত শেনজেন ভিসার বিকল্প হিসেবে ETIAS-কে দেখা ঠিক হবে না।
অর্থাৎ ইউরোপের ক্ষেত্রে EES ইতোমধ্যে কার্যকর, আর ETIAS সামনে চালু হওয়ার অপেক্ষায়—দুটি ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ও যাত্রীগোষ্ঠীও আলাদা।
ডিজিটাল সীমান্ত ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশ্বের বড় এভিয়েশন হাবগুলোর যাত্রী প্রবাহেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
২০২৫ সালে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (DXB) রেকর্ড ৯ কোটি ৫২ লাখ যাত্রী পরিচালনা করেছে, যা বিমানবন্দরটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। Dubai Airports-এর তথ্য অনুযায়ী, এটি কোনো একটি বিমানবন্দরে এক বছরে পরিচালিত আন্তর্জাতিক যাত্রীরও রেকর্ড।
দুবাই এখন শুধু আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংযোগকেন্দ্র নয়, নিজেও একটি বড় পর্যটন ও ব্যবসায়িক গন্তব্য। ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে DXB-এর যাত্রী মিশ্রণ প্রায় সমানভাবে ট্রানজিট এবং দুবাইয়ে যাত্রা শেষ বা শুরু করা পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট যাত্রীদের মধ্যে ভাগ হয়েছে বলে বিমানবন্দরটির প্রধান নির্বাহীর বক্তব্যে উঠে এসেছে।
তবে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে আঞ্চলিক আকাশসীমার বিঘ্ন DXB-এর মোট যাত্রী পরিবহনে বড় প্রভাব ফেলেছে। প্রথম ছয় মাসে বিমানবন্দরটি ৩ কোটি ১৫ লাখ যাত্রী পরিচালনা করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ কম। Dubai Airports বলছে, আন্তর্জাতিক ট্রান্সফার যাত্রী এখনো DXB-এর মোট ট্রাফিকের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।
একটি সফল আন্তর্জাতিক হাবের জন্য এখন শুধু বেশি গন্তব্যে ফ্লাইট থাকাই যথেষ্ট নয়। দ্রুত ও সহজ ট্রানজিট, ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া, ডিজিটাল বর্ডার সিস্টেম, ব্যাগেজ ট্রান্সফার এবং যাত্রীর সামগ্রিক অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
DXB বর্তমানে ১০৮টি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনের মাধ্যমে ১১০টি দেশের ২৯১টি গন্তব্যের সঙ্গে সংযুক্ত। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক দুবাইকে আন্তর্জাতিক সংযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
অন্যদিকে ইউরোপের ফ্রাঙ্কফুর্ট, প্যারিস, আমস্টারডাম ও মাদ্রিদের মতো প্রতিষ্ঠিত হাবগুলোর পাশাপাশি ইস্তাম্বুল, দোহা এবং এশিয়ার বড় বিমানবন্দরগুলোও আন্তর্জাতিক সংযোগকারী যাত্রীর বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ডিজিটাল সীমান্ত ব্যবস্থার বিস্তারের কারণে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য ভ্রমণের আগে শুধু পাসপোর্ট ও ভিসা পরীক্ষা করলেই আর সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট নাও হতে পারে।
গন্তব্য ও ট্রানজিট দেশের নিয়ম অনুযায়ী ভিসা, ETA বা অন্যান্য ট্রাভেল অথরাইজেশন, ট্রানজিট ভিসা, পাসপোর্টের মেয়াদ এবং ডিজিটাল সীমান্ত প্রক্রিয়া আগেই যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এয়ারলাইনগুলোর ক্ষেত্রেও দায়িত্ব বাড়ছে। ইউরোপে EES পুরোপুরি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে কিছু তৃতীয় দেশের যাত্রীর ক্ষেত্রে যাত্রার আগেই প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাইয়ে পরিবহন সংস্থাগুলোর নতুন বাধ্যবাধকতা কার্যকর হয়েছে।
সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক বিমান ভ্রমণ দ্রুত ডিজিটাল ও তথ্যনির্ভর সীমান্ত ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। যুক্তরাজ্যের ETA, ইউরোপের EES ও আসন্ন ETIAS যেমন যাত্রী যাচাইয়ের পদ্ধতি বদলে দিচ্ছে, তেমনি দুবাইয়ের মতো বড় এভিয়েশন হাবের যাত্রী প্রবাহের পরিবর্তনও দেখাচ্ছে—ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু কে বেশি যাত্রী পরিবহন করছে তা নিয়ে নয়; বরং কে যাত্রীকে সহজ, দ্রুত এবং নির্বিঘ্ন আন্তর্জাতিক সংযোগ দিতে পারছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সূত্র: UK Government, European Commission, Dubai Airports