
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে ভারতের দিল্লিগামী লুফথানসার একটি বোয়িং ৭৮৭-৯ উড়োজাহাজ আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে ডাইভার্ট করে নিরাপদে অবতরণ করেছে। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) পরিচালিত ফ্লাইট LH760-এর ক্রুরা যাত্রাপথে কারিগরি সমস্যা শনাক্ত করার পর সতর্কতামূলকভাবে ফ্লাইটটি আর চালিয়ে না গিয়ে বাকুর হেইদার আলিয়েভ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সিদ্ধান্ত নেন।
ফ্লাইটটিতে ব্যবহৃত উড়োজাহাজটি ছিল বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার, নিবন্ধন নম্বর D-ABPH। হেইদার আলিয়েভ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি স্থানীয় সময় রাত ১১টা ২৬ মিনিটে নিরাপদে অবতরণ করে এবং যাত্রী ও ক্রুদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
প্রকাশিত ফ্লাইট তথ্য অনুযায়ী, LH760 তুর্কমেনিস্তানের ওপর দিয়ে প্রায় ৩৯ হাজার ফুট (FL390) উচ্চতায় উড়ছিল। এ সময় উড়োজাহাজটির ADS-B-এর মাধ্যমে সম্প্রচারিত অবস্থান তথ্যে বড় ধরনের অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। এরপর ক্রুরা ফ্লাইটটি দিল্লির দিকে চালিয়ে না গিয়ে বাকুতে ডাইভার্ট করেন।
লুফথানসার একজন মুখপাত্র জার্মান সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সমস্যাটি স্যাটেলাইট যোগাযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ক্রুরা ফ্লাইট চালিয়ে না গিয়ে উড়োজাহাজের সিস্টেমগুলো ভূমিতে পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত নেন।
ঘটনার সময় উড়োজাহাজটির ADS-B অবস্থান তথ্যে এতটাই অস্বাভাবিকতা দেখা যায় যে ট্র্যাকিং ডাটায় এক পর্যায়ে উড়োজাহাজটির অবস্থান বাস্তব ফ্লাইটপথের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রদর্শিত হচ্ছিল।
ADS-B বা Automatic Dependent Surveillance–Broadcast এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে উড়োজাহাজ তার পরিচয়, অবস্থান, উচ্চতাসহ বিভিন্ন তথ্য সম্প্রচার করে। এয়ার ট্রাফিক নজরদারি ও বেসামরিক ফ্লাইট ট্র্যাকিংয়ে এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে কোনো ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্মে অস্বাভাবিক অবস্থান দেখা যাওয়াকে এককভাবে উড়োজাহাজের প্রকৃত অবস্থান বা নেভিগেশন সক্ষমতা হারানোর প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সিস্টেমের কারিগরি পরীক্ষা ও অপারেটরের তদন্তই সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করে।
বাকু বিমানবন্দরের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে জরুরি অবতরণের অনুরোধ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও লুফথানসা এটিকে সতর্কতামূলক নিরাপত্তা অবতরণ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এয়ারলাইনটির ভাষ্য অনুযায়ী, যাত্রী ও ক্রুর জন্য কোনো সময়ই তাৎক্ষণিক বিপদের পরিস্থিতি তৈরি হয়নি এবং নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েই বাকুতে অবতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ফ্লাইটটির সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু অপারেশনাল তথ্যে উড়োজাহাজটির বিভিন্ন কারিগরি ও যোগাযোগ-সংক্রান্ত বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রকাশ্যে যাচাইযোগ্য নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে IRU, AHRU বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট সেন্সরের ত্রুটিকেই ডাইভারশনের সরাসরি কারণ হিসেবে নিশ্চিত করা যায়নি।
একইভাবে সাময়িক HF যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার তথ্যের সঙ্গে বাকুতে ডাইভার্ট করার সরাসরি সম্পর্কও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
তাই এখন পর্যন্ত ঘটনাটিকে প্রযুক্তিগত ও স্যাটেলাইট যোগাযোগ-সংক্রান্ত সমস্যা এবং অস্বাভাবিক অবস্থান তথ্যের প্রেক্ষাপটে নেওয়া সতর্কতামূলক সিদ্ধান্ত হিসেবেই বর্ণনা করা সবচেয়ে সঠিক।
হেইদার আলিয়েভ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর জানিয়েছে, তাদের অবকাঠামো ডাইভার্টেড ও ট্রানজিট ফ্লাইট গ্রহণের জন্য প্রস্তুত এবং আঞ্চলিক বিমান চলাচলে বিমানবন্দরটি বিকল্প গন্তব্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
দীর্ঘপাল্লার কোনো ফ্লাইটে প্রযুক্তিগত অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে ক্রুরা সমস্যার ধরন, উড়োজাহাজের অবস্থা, আবহাওয়া, রানওয়ের সক্ষমতা, জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা এবং কাছাকাছি উপযুক্ত বিমানবন্দরের অবস্থান বিবেচনা করে ডাইভারশনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে বোয়িং ৭৮৭-৯ পরিচালনার উপযোগী অবকাঠামো থাকায় বাকু নিরাপদ বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
ঘটনায় কোনো হতাহত বা উড়োজাহাজের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মূল প্রযুক্তিগত সমস্যা শনাক্ত হওয়ার পর ক্রুরা ঝুঁকি না নিয়ে উড়োজাহাজটিকে নিরাপদ বিমানবন্দরে নামিয়ে সিস্টেম পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।
এই ধরনের ডাইভারশন বাণিজ্যিক বিমান চলাচলে প্রতিষ্ঠিত নিরাপত্তা ব্যবস্থারই অংশ। কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে সমস্যা গুরুতর হওয়ার অপেক্ষা না করে উপযুক্ত বিমানবন্দরে অবতরণ করে কারিগরি পরীক্ষা করানোই নিরাপত্তাভিত্তিক পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ নীতি।
সূত্র: Lufthansa, Heydar Aliyev International Airport and The Aviation Heral