
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
রাজস্ব বাড়লেও উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, উড়োজাহাজের স্বল্পতা ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটে ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে Kenya Airways। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে এয়ারলাইনটির কর-পরবর্তী লোকসান বেড়ে ১৬.১ বিলিয়ন কেনিয়ান শিলিংয়ে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে লোকসান ছিল ১২.২ বিলিয়ন শিলিং। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে লোকসান বেড়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ।
তবে একই সময়ে এয়ারলাইনটির রাজস্ব ৯ শতাংশ বেড়ে ৮১.২৫ বিলিয়ন শিলিং হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্ধবার্ষিক রাজস্ব। শক্তিশালী যাত্রী চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পরিচালন ব্যয় আরও দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি রাজস্ব শেষ পর্যন্ত মুনাফায় রূপান্তর করতে পারেনি কেনিয়া এয়ারওয়েজ।
কেনিয়া এয়ারওয়েজের আর্থিক ফলাফল অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে ১০.৬ বিলিয়ন শিলিং। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ লোকসান ছিল ৬.২ বিলিয়ন শিলিং।
এ সময় মোট পরিচালন ব্যয় প্রায় ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিপরীতে রাজস্ব বেড়েছে ৯ শতাংশ। ফলে আয় বাড়লেও ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি বেশি হওয়ায় এয়ারলাইনটির আর্থিক ফলাফলের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
এয়ারলাইনটির চেয়ারম্যান কিপরোনো কিটোনি জানিয়েছেন, উচ্চ ব্যয় ও কঠিন পরিচালন পরিবেশ সামগ্রিক নেটওয়ার্কের profitability-এর ওপর চাপ তৈরি করেছে।
প্রথম ছয় মাসে কেনিয়া এয়ারওয়েজের সবচেয়ে বড় চাপগুলোর একটি ছিল jet fuel-এর মূল্য বৃদ্ধি।
এয়ারলাইনটির হিসাবে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় জ্বালানি ব্যয় ৩২ শতাংশ বেড়ে প্রায় ২৯ বিলিয়ন শিলিংয়ে পৌঁছেছে। মোট operating expenses-এর প্রায় ৩২ শতাংশ এবং direct operating costs-এর প্রায় ৫২ শতাংশই ছিল জ্বালানি ব্যয়।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে jet fuel-এর দাম বেড়ে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে এয়ারলাইনটি।
কেনিয়া এয়ারওয়েজ জানিয়েছে, এই ব্যয় বৃদ্ধি তাদের profit margin-এর ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করেছে।
আর্থিক ফলাফলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কেনিয়া এয়ারওয়েজের সমস্যার পেছনে শুধু যাত্রী চাহিদার দুর্বলতা কাজ করছে না।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে এয়ারলাইনটির উপলব্ধ passenger capacity আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ কম ছিল। তারপরও যাত্রী চাহিদা শক্তিশালী ছিল এবং cabin factor প্রায় চার percentage point উন্নত হয়েছে।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি রুটে load factor ৯০ শতাংশের বেশি ছিল বলেও এয়ারলাইনটির ব্যবস্থাপনা জানিয়েছে।
কেনিয়া এয়ারওয়েজের ভারপ্রাপ্ত গ্রুপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী George Kamal-এর ভাষ্য অনুযায়ী, এয়ারলাইনটির জন্য বড় সমস্যা যাত্রীর অভাব নয়; বরং চাহিদা অনুযায়ী সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ পাওয়া।
বৈশ্বিক supply-chain সংকট কেনিয়া এয়ারওয়েজের বহর পরিচালনায় বড় প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে engine ও গুরুত্বপূর্ণ spare parts-এর স্বল্পতা এবং component সরবরাহে দীর্ঘ সময় লাগায় একাধিক উড়োজাহাজ প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।
২০২৫ সালেও তিনটি Boeing 787-8 Dreamliner দীর্ঘ সময় গ্রাউন্ডেড ছিল। এগুলো এয়ারলাইনটির widebody fleet-এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সমপরিমাণ সক্ষমতা প্রতিনিধিত্ব করত।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধেও aircraft availability পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ফলে শক্তিশালী চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কিছু আন্তর্জাতিক রুটে পর্যাপ্ত আসন সরবরাহ করতে পারেনি এয়ারলাইনটি।
উড়োজাহাজ গ্রাউন্ডেড থাকলে একটি এয়ারলাইনের seat capacity কমলেও অনেক fixed cost থেকে যায়। একই সঙ্গে সম্ভাব্য যাত্রী ও cargo revenue হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হয়। কেনিয়া এয়ারওয়েজের ক্ষেত্রে এই দুই ধরনের চাপই আর্থিক ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে কেনিয়া এয়ারওয়েজের রাজস্ব ৭৪.৫ বিলিয়ন শিলিং থেকে বেড়ে ৮১.২৫ বিলিয়ন শিলিংয়ে পৌঁছেছে।
এটি প্রায় ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং এয়ারলাইনটির ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্ধবার্ষিক revenue performance।
এ সময় cargo business-এও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। কার্গো রাজস্ব প্রায় ১৮ শতাংশ বেড়ে ৮.৭৭ বিলিয়ন শিলিংয়ে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ আর্থিক ফলাফলের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল revenue generation নয়; বরং সেই রাজস্বের তুলনায় operating cost-এর দ্রুত বৃদ্ধি।
দ্বিতীয়ার্ধে operational capacity বাড়ানোর ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতিও হয়েছে।
একটি Boeing 787-8 Dreamliner জুলাইয়ে আবার কার্যক্রমে ফিরেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন Turkish Airlines-এর কাছে লিজে থাকা একটি Boeing 777-300ER কেনিয়া এয়ারওয়েজের বহরে ফিরে এসেছে।
বড় উড়োজাহাজ বহরে ফেরায় দীর্ঘপাল্লার রুটে passenger seat এবং belly cargo capacity বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে শুধু উড়োজাহাজ বহরে ফেরানোই যথেষ্ট নয়। নতুন বা ফেরত আসা capacity থেকে পর্যাপ্ত revenue অর্জন এবং aircraft leasing, fuel ও maintenance cost নিয়ন্ত্রণ করা এয়ারলাইনটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে কেনিয়া এয়ারওয়েজের বোর্ড একটি strategic investor খোঁজার প্রক্রিয়াও অনুমোদন করেছে।
এয়ারলাইনটি একই সঙ্গে balance sheet শক্তিশালী করা, ঋণ পুনর্গঠন, নতুন মূলধন সংগ্রহ, বহরের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং operational reliability বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
কেনিয়া এয়ারওয়েজ দীর্ঘদিন ধরেই উল্লেখযোগ্য ঋণ ও negative equity-এর চাপ মোকাবিলা করছে। ফলে পরিচালন কার্যক্রমের উন্নতির পাশাপাশি আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠনও প্রতিষ্ঠানটির turnaround strategy-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কেনিয়া এয়ারওয়েজের বর্তমান সংকটকে শুধু কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। সাম্প্রতিক সময়ে এয়ারলাইনটির জন্য আরও বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে উড়োজাহাজ ও ইঞ্জিনের প্রাপ্যতা, spare parts সংকট, জ্বালানি মূল্য এবং উচ্চ অর্থায়ন ব্যয়।
২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে তিনটি Dreamliner গ্রাউন্ডেড থাকার কারণে এয়ারলাইনটির passenger capacity ১৬ শতাংশ কমে গিয়েছিল। ওই সময়ে রাজস্বও ১৯ শতাংশ কমেছিল।
২০২৬ সালে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। এবার কম capacity নিয়েও revenue বাড়াতে সক্ষম হয়েছে কেনিয়া এয়ারওয়েজ। কিন্তু fuel ও অন্যান্য operating cost বেড়ে যাওয়ায় আর্থিক ফলাফলে সেই উন্নতির সুবিধা পাওয়া যায়নি।
কেনিয়া এয়ারওয়েজের ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের ফলাফল তাই এক ধরনের বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। একদিকে যাত্রী চাহিদা রয়েছে, রাজস্ব বেড়েছে এবং cargo business-ও সম্প্রসারিত হয়েছে। অন্যদিকে aircraft availability সংকট ও দ্রুত বাড়তে থাকা operating cost সেই প্রবৃদ্ধির সুবিধা কমিয়ে দিয়েছে।
আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ network carrier হিসেবে কেনিয়া এয়ারওয়েজ Nairobi-এর Jomo Kenyatta International Airport-কে কেন্দ্র করে আফ্রিকার বিভিন্ন শহরের সঙ্গে ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার সংযোগ তৈরি করে।
ফলে এয়ারলাইনটির পুনরুদ্ধারের জন্য শুধু ব্যয় কমানো নয়, পর্যাপ্ত উড়োজাহাজ সচল রাখা, long-haul capacity পুনরুদ্ধার, উচ্চ চাহিদার রুটগুলো থেকে বেশি আয় করা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও মূলধন কাঠামোর সমাধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে বহরে উড়োজাহাজ ফেরার পর বাড়তি capacity থেকে কতটা আয় করতে পারে এবং জ্বালানি ও maintenance cost কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে—তার ওপর কেনিয়া এয়ারওয়েজের আর্থিক পুনরুদ্ধারের পরবর্তী ধাপ অনেকাংশে নির্ভর করবে।
সূত্র: Kenya Airways Half Year Financial Results 2026