
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট সেবায় এয়ারএশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বিমানবন্দরের পরিচালন দক্ষতা বাড়াতে বৃহত্তর অংশীদারত্বের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখেছে দুই পক্ষ।
গত ১৭ ও ১৮ আগস্ট মালয়েশিয়া সফর করে বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। এতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ছিলেন।
সফরকালে প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত ক্যাপিটাল এ-এর প্রধান নির্বাহী টনি ফার্নান্দেজের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট সেবায় এয়ারএশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতার বিষয়টি উঠে আসে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে সম্ভাব্য বিনিয়োগ নিয়েও আলোচনা হয়।
তবে এখন পর্যন্ত এটি সম্ভাব্য সহযোগিতা ও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে। এয়ারএশিয়াকে বাংলাদেশের কোনো বিমানবন্দর পরিচালনা বা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তির তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এমন সময়ে, যখন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং প্রযুক্তিনির্ভর যাত্রীসেবা চালুর বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল কুয়ালালামপুরে এয়ারএশিয়া গ্রুপের সদর দপ্তর RedQ পরিদর্শন করে। সেখানে এয়ারএশিয়া গ্রুপের প্রধান নির্বাহী বো লিঙ্গাম প্রতিনিধিদলকে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক ও পরিচালন মডেল এবং এভিয়েশন খাতে সম্ভাব্য সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র সম্পর্কে অবহিত করেন।
এরপর কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-২-এ এয়ারএশিয়ার অপারেশন এবং Ground Team Red (GTR)-এর গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে প্রতিনিধিদল।
GTR মালয়েশিয়ায় যাত্রীসেবা, র্যাম্প, কার্গো ও গ্রাউন্ড সাপোর্টসহ বিভিন্ন ধরনের বিমানবন্দর সেবা দিয়ে থাকে এবং দেশটির ১৭টি স্টেশনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সফরে এয়ারএশিয়ার Low-Cost Carrier (LCC) পরিচালন মডেলের বিভিন্ন দিক বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের সামনে তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে ছিল দ্রুত aircraft turnaround, প্রযুক্তিনির্ভর যাত্রীসেবা এবং বিমানবন্দরের অবকাঠামো দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহারের বিভিন্ন পদ্ধতি।
প্রতিনিধিদল বিশেষভাবে automated check-in, self-service baggage drop, dual-door boarding, উন্নত apron management এবং digital baggage system পর্যবেক্ষণ করে। এসব ব্যবস্থার লক্ষ্য হচ্ছে যাত্রীর অপেক্ষার সময় ও অতিরিক্ত জনবলনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বিমানবন্দরের পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং উড়োজাহাজের ব্যবহার বাড়ানো।
একটি উড়োজাহাজ যত দ্রুত যাত্রী নামানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ব্যাগেজ ও কার্গো ওঠানো-নামানো, নতুন যাত্রী বোর্ডিং এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় গ্রাউন্ড কার্যক্রম শেষ করে পরবর্তী ফ্লাইটে যেতে পারে, সেটির দৈনিক ব্যবহার তত বাড়ানো সম্ভব হয়।
মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের দক্ষ পরিচালন ব্যবস্থায় একটি উড়োজাহাজ দিনে প্রায় ৬ থেকে ৮টি ফ্লাইট সেক্টর পরিচালনা করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে শুধু একটি বিদেশি এয়ারলাইনের পরিচালন ব্যবস্থা দেখা নয়; বরং বিমানবন্দর পরিচালনার ক্ষেত্রে automation, self-service এবং digital passenger processing কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করা।
বিশেষ করে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে চেক-ইন, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, বোর্ডিং এবং aircraft turnaround আরও দক্ষ করার প্রয়োজন বাড়ছে।
স্বয়ংক্রিয় চেক-ইন ও self-service baggage drop যাত্রীর প্রাথমিক প্রক্রিয়া দ্রুত করতে পারে। ডিজিটাল ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা লাগেজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে কার্যকর apron management এবং দ্রুত turnaround একই অবকাঠামো ব্যবহার করে আরও দক্ষতার সঙ্গে ফ্লাইট পরিচালনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে মালয়েশিয়ায় ব্যবহৃত কোনো নির্দিষ্ট ব্যবস্থা বাংলাদেশে কার্যকর করতে হলে স্থানীয় বিমানবন্দরের অবকাঠামো, যাত্রীপ্রবাহ, নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করতে হবে।
গ্রাউন্ড অপারেশনের পাশাপাশি বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল Asia Digital Engineering (ADE)-এর নবনির্মিত ১৪-লাইন Maintenance, Repair and Overhaul (MRO) স্থাপনাও পরিদর্শন করে। সেখানে আধুনিক উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে fleet reliability ও operational efficiency বাড়ানোর বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে তাদের ধারণা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের জন্য MRO-ও গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র। দেশে বৃহত্তর MRO সক্ষমতা তৈরি হলে ভবিষ্যতে উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রকৌশলসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের একটি বড় অংশ স্থানীয়ভাবে করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে AirAsia বা ADE বাংলাদেশে MRO বিনিয়োগ করবে—এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এই সফরে ঘোষণা করা হয়নি।
সফরের দ্বিতীয় দিন ১৮ আগস্ট পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতি উপমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত। সেখানে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ফ্লাইটের সংখ্যা বৃদ্ধি, ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও pre-verification, পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
মালয়েশিয়ার পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতে দক্ষ বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে।
মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র কাছ থেকে দেখেছে—দক্ষ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, প্রযুক্তিনির্ভর বিমানবন্দর পরিচালনা এবং আধুনিক MRO ব্যবস্থা। একই সঙ্গে এসব ক্ষেত্রে AirAsia ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনাও আলোচনা হয়েছে।
AirAsia নিজেও জানিয়েছে, সফরটি দুই দেশের মধ্যে knowledge sharing ও technology transfer-এর নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, বিমান পরিবহন ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে।
এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে আলোচনা পরবর্তী সময়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব, বিনিয়োগ পরিকল্পনা বা চুক্তিতে রূপ নেয় কি না। কারণ সম্ভাব্য সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে এর পরিধি, বিনিয়োগ কাঠামো, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং বাংলাদেশের বিদ্যমান বিমানবন্দর পরিচালনা ব্যবস্থার সঙ্গে সেটি কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এসব বিষয় তখন নির্ধারণ করতে হবে।
তথ্যসূত্র: বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য, AirAsia-এর আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা এবং সংশ্লিষ্ট প্রকাশিত তথ্য।