
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে সক্ষমতা বাড়াতে তিনটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার ড্রাই লিজে নিতে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। আগের দরপত্রে প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় গত ১০ আগস্ট নতুন ‘রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল’ (RFP) প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটি।
নতুন দরপত্র অনুযায়ী, তিনটি উড়োজাহাজ ৭২ মাস বা ছয় বছরের জন্য লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাব জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ আগস্ট সকাল ১০টা।
বিমান যত দ্রুত সম্ভব উড়োজাহাজগুলো বহরে যুক্ত করতে চায়। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারির মধ্যে সরবরাহ চাওয়া হয়েছে। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরবরাহ করা সম্ভব—এমন উড়োজাহাজও কারিগরি মূল্যায়নে বিবেচনা করা হবে।
বিমান উড়োজাহাজ তিনটি নেবে ড্রাই লিজে। এই ব্যবস্থায় লিজদাতা মূলত উড়োজাহাজ সরবরাহ করবে। পাইলট, কেবিন ক্রু, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিমাসহ অপারেশনাল দায়িত্ব থাকবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের।
ফলে নতুন তিনটি ৭৮৭-৯ বহরে যুক্ত হলে শুধু উড়োজাহাজ সংগ্রহ করলেই হবে না; সেগুলো পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত বৈমানিক, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী ও কারিগরি সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিটি উড়োজাহাজ বছরে প্রায় ৪ হাজার ঘণ্টা পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বিমানের।
দরপত্রে উড়োজাহাজের বয়স ও কারিগরি অবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত শর্ত দিয়েছে বিমান।
২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রস্তাবিত উড়োজাহাজের বয়স ১৫ বছরের বেশি হতে পারবে না। এতে GEnx-1B74/75 ইঞ্জিন থাকতে হবে এবং সর্বোচ্চ টেক-অফ ওজন হতে হবে ২ লাখ ৫৪ হাজার কেজি।
একই লিজদাতার কাছ থেকে একই ধরনের তিনটি উড়োজাহাজ পাওয়ার বিষয়টিকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই কনফিগারেশনের উড়োজাহাজ পাওয়া গেলে পরিচালনা, প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য বজায় রাখা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
কেবিন কনফিগারেশনেও নির্দিষ্ট শর্ত রেখেছে বিমান।
প্রতিটি বোয়িং ৭৮৭-৯-এ দুই শ্রেণি মিলিয়ে ৩০০টির বেশি আসন থাকতে হবে। বিজনেস ক্লাসে থাকতে হবে ১৮০ ডিগ্রি ফুল-ফ্ল্যাট আসন।
ইকোনমি ক্লাসের আসনে কমপক্ষে ৩১ ইঞ্চি সিট পিচ থাকতে হবে। একই সঙ্গে সব আসন নতুন হওয়ার শর্তও দেওয়া হয়েছে।
এসব শর্ত থেকে বোঝা যায়, শুধু অতিরিক্ত উড়োজাহাজ সংগ্রহ নয়, দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রীসেবার নির্দিষ্ট মান বজায় রাখার বিষয়টিও লিজ পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
উড়োজাহাজগুলো নতুন করে সি-চেক সম্পন্ন করার পর সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় বিমানকে সরবরাহ করতে হবে।
লিজের প্রথম ২৪ মাসের মধ্যে বড় ধরনের নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা ল্যান্ডিং গিয়ার ওভারহলের প্রয়োজন না হওয়ার শর্তও রাখা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি ড্রাই লিজের ক্ষেত্রে উড়োজাহাজের কারিগরি অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লিজ নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হলে এয়ারলাইনটির পরিচালন ব্যয় ও উড়োজাহাজের প্রাপ্যতা—দুই ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হতে পারে।
প্রস্তাবিত উড়োজাহাজে আধুনিক এভিওনিকস এবং প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও নেভিগেশন প্রযুক্তি থাকার শর্ত দিয়েছে বিমান।
এর মধ্যে রয়েছে ফ্লাইট ও ইঞ্জিন হেলথ মনিটরিং, TCAS 7.1, ACARS, স্যাটেলাইট যোগাযোগ এবং GPS/GNSS নেভিগেশন সুবিধা।
এ ছাড়া উড়োজাহাজগুলো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নিজস্ব লিভারিতে রং করে দেওয়ার ব্যয়ও লিজদাতাকে বহন করতে হবে।
দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কারিগরি ও আর্থিক—দুই ধরনের প্রস্তাবই বিবেচনা করবে বিমান।
তবে মূল্যায়নে কারিগরি প্রস্তাবের গুরুত্ব ২৫ শতাংশ এবং আর্থিক প্রস্তাবের গুরুত্ব ৭৫ শতাংশ রাখা হয়েছে।
ফলে প্রয়োজনীয় কারিগরি শর্ত পূরণের পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক লিজ মূল্য ও আর্থিক শর্ত প্রস্তাবকারী প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে।
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে মোট ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর, চারটি ৭৮৭-৮, দুটি ৭৮৭-৯, চারটি ৭৩৭ এবং পাঁচটি ড্যাশ-৮-৪০০।
পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন তিনটি ৭৮৭-৯ যুক্ত হলে, অন্য কোনো উড়োজাহাজ বহর থেকে বাদ না পড়লে বিমানের বহর ২২টিতে উন্নীত হতে পারে। একই সঙ্গে বোয়িং ৭৮৭ পরিবারের উড়োজাহাজের সংখ্যা ছয়টি থেকে বেড়ে দাঁড়াবে নয়টিতে।
বিশেষ করে দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে অতিরিক্ত তিনটি ৭৮৭-৯ বিমানের জন্য বাড়তি সক্ষমতা তৈরি করতে পারে। বিদ্যমান রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো, উড়োজাহাজের কারিগরি সমস্যার সময় বিকল্প সক্ষমতা রাখা এবং নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্য বিবেচনার ক্ষেত্রেও বহর সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ড্রাই লিজের প্রকৃত বাণিজ্যিক সুফল নির্ভর করবে লিজ ব্যয়, উড়োজাহাজের ব্যবহার, রুটের যাত্রীচাহিদা, টিকিট থেকে আয় এবং সামগ্রিক পরিচালন ব্যয়ের ওপর।
নতুন দরপত্রে উপযুক্ত প্রস্তাব পাওয়া গেলে ২০২৭ সালের শুরু থেকেই তিনটি ৭৮৭-৯ বহরে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে বিমানের। সেটি বাস্তবায়িত হলে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক অপারেশনে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা বাড়তে পারে।
সূত্র: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (RFP) সংক্রান্ত তথ্য