
বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়াতে ই-ভিসা চালু, ভিসা অন অ্যারাইভাল প্রক্রিয়া সহজ করা, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলা এবং ঢাকায় আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য স্টপওভার প্রোগ্রাম চালুর প্রস্তাব দিয়েছে ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (টিটিডিসি)।
সংস্থাটির নতুন পর্যটন উন্নয়ন রূপরেখায় বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও বৈচিত্র্যময় পর্যটন সম্পদ থাকা সত্ত্বেও দুর্বল আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং, সীমিত প্রচারণা, ভিসা জটিলতা এবং বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
গত ৮ আগস্ট ঢাকায় টিটিডিসির নির্বাহী কমিটির সদস্য সাদিয়া হক ‘Destination Bangladesh: A Blueprint for Tourism That Welcomes the World’ শীর্ষক রূপরেখাটি উপস্থাপন করেন।
টিটিডিসির রূপরেখায় বাংলাদেশের তিনটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য, দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, সাত শতাধিক নদী, দ্বীপ, জলাভূমি এবং বৈচিত্র্যময় খাবার, সংগীত, কারুশিল্প ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, এসব পর্যটন সম্পদকে একটি শক্তিশালী ও ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের অধীনে বিশ্ববাজারে যথেষ্টভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি।
রূপরেখায় উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক আগমন ছিল প্রায় সাড়ে ছয় লাখ। তবে টিটিডিসির হিসাবে, এর মধ্যে প্রকৃত অবকাশযাপনকারী বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০ থেকে ৫০ হাজার।
আন্তর্জাতিক আগমনের সব যাত্রীকে পর্যটক হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। ব্যবসা, কর্মসংস্থান, পরিবার-পরিজন দেখা কিংবা অন্যান্য উদ্দেশ্যে আসা বিদেশিরাও আন্তর্জাতিক আগমনের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। ফলে অবকাশযাপনকারী পর্যটকের আলাদা তথ্য পর্যটন বাজারের প্রকৃত আকার বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
টিটিডিসির রূপরেখায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পর্যটন প্রচারে বাংলাদেশ বছরে ১০ লাখ ডলারেরও কম ব্যয় করে।
সংস্থাটির মতে, শুধু পর্যটন গন্তব্য তৈরি করলেই বিদেশি পর্যটক বাড়বে না। নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক বাজার চিহ্নিত করে ধারাবাহিক ডিজিটাল প্রচারণা, আন্তর্জাতিক ট্রাভেল মার্টে অংশগ্রহণ, এয়ারলাইনস ও ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে যৌথ প্রচারণা এবং মানসম্মত পর্যটন কনটেন্ট তৈরিও প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে একটি ধারাবাহিক ‘Destination Bangladesh’ ব্র্যান্ড তৈরি করে একই বার্তা দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিদেশি পর্যটকদের বাংলাদেশ ভ্রমণ সহজ করতে ই-ভিসা ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছে টিটিডিসি।
পাশাপাশি বিমানবন্দরে ভিসা অন অ্যারাইভাল প্রক্রিয়া আরও সহজ করা এবং স্থলবন্দর দিয়ে আসা পর্যটকদের জন্য সুবিধা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
পর্যটনের ক্ষেত্রে ভিসা প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একজন সম্ভাব্য পর্যটক কোনো গন্তব্য নির্বাচন করার সময় বিমানভাড়া ও হোটেলের পাশাপাশি ভিসা পেতে কত সময় লাগবে, আবেদন কতটা সহজ এবং কী কী নথি প্রয়োজন—এসব বিষয়ও বিবেচনা করেন।
অনলাইনে আবেদন, ফি প্রদান, অনুমোদন এবং ভ্রমণের আগে প্রয়োজনীয় যাচাই সম্পন্ন করার ব্যবস্থা থাকলে বিদেশি পর্যটকের জন্য ভ্রমণ পরিকল্পনা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
টিটিডিসি আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক আগমন ১২ লাখে এবং এক দশকের মধ্যে ২০ লাখের বেশি করার লক্ষ্য নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে।
একই সঙ্গে পর্যটন থেকে ১৫০ কোটি ডলার আয়, জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান ৫ থেকে ৭ শতাংশে উন্নীত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে পাঁচ লাখের বেশি নতুন কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য সামনে রাখার কথা বলা হয়েছে।
এগুলো টিটিডিসির প্রস্তাবিত লক্ষ্য; বাস্তবে অর্জন করতে হলে ভিসা সহজীকরণ, আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ, পর্যটন অবকাঠামো, নিরাপত্তা, সেবার মান, বিপণন এবং বেসরকারি বিনিয়োগসহ একাধিক ক্ষেত্রে সমন্বিত অগ্রগতি প্রয়োজন হবে।
টিটিডিসি সুন্দরবন, সিলেট, কুয়াকাটা, উত্তরবঙ্গ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলকে ইকো-ট্যুরিজমের গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে সহজে প্রচার ও বিক্রি করা যায়—এমন ‘সিগনেচার ট্যুরিজম সার্কিট’ তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ ধরনের সার্কিটে একাধিক গন্তব্যকে একটি পরিকল্পিত ভ্রমণপথের মধ্যে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে বিদেশি পর্যটক একটি সফরেই বাংলাদেশের প্রকৃতি, ঐতিহ্য, খাবার ও সংস্কৃতির একাধিক অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
তবে ইকো-ট্যুরিজম সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে পর্যটক বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশের ধারণক্ষমতা, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যটন বিকাশের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিমান যোগাযোগকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে টিটিডিসি।
রূপরেখায় দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল চুক্তি সম্প্রসারণ, দেশীয় এয়ারলাইনসের সক্ষমতা বাড়ানো এবং কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সরাসরি কোনো পর্যটন গন্তব্যের কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ থাকলে সময় ও অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের জটিলতা কমতে পারে।
তবে একটি বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু অবকাঠামো যথেষ্ট নয়। পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক রুট, ট্রানজিট যাত্রী, এয়ারলাইনসের বাণিজ্যিক আগ্রহ, প্রতিযোগিতামূলক পরিচালন ব্যয় এবং কার্যকর কানেক্টিভিটিও প্রয়োজন।
রূপরেখার আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব হচ্ছে ঢাকাকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি ট্রানজিট হাব হিসেবে গড়ে তোলা।
এ জন্য ই-ট্রানজিট ভিসা, অনলাইন প্রি-ক্লিয়ারেন্স, উন্নত বিমানবন্দর সুবিধা, বিমানবন্দর থেকে শহরে দ্রুত যোগাযোগ এবং স্টপওভার প্রোগ্রাম চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্টপওভার প্রোগ্রামে আন্তর্জাতিক ট্রানজিট যাত্রীকে কয়েক ঘণ্টা বা এক-দুই দিনের জন্য শহর ঘুরে দেখা, হোটেলে অবস্থান কিংবা নির্ধারিত পর্যটন প্যাকেজ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হাব বিমানবন্দর ও এয়ারলাইনস ট্রানজিট যাত্রীকে পর্যটকে রূপান্তরের কৌশল হিসেবে এ ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করে।
বাংলাদেশেও কার্যকর ট্রানজিট ভিসা, সুবিধাজনক ফ্লাইট সংযোগ এবং পরিকল্পিত পর্যটন প্যাকেজ তৈরি করা গেলে ট্রানজিট যাত্রীর একটি অংশকে স্বল্পমেয়াদি দর্শনার্থীতে রূপান্তরের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
টিটিডিসির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পর্যটন শুধু পর্যটন মন্ত্রণালয় বা ট্যুর অপারেটরদের কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বিদেশি পর্যটকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভিসা, ইমিগ্রেশন, বিমানবন্দর, এয়ারলাইনস, সড়ক ও রেল যোগাযোগ, হোটেল, ডিজিটাল পেমেন্ট, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং পর্যটন তথ্যসেবা—সবকিছু যুক্ত।
ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতামূলক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে সরকার, এয়ারলাইনস, হোটেল, ট্যুর অপারেটর, বিনিয়োগকারী, গণমাধ্যম ও কনটেন্ট নির্মাতাদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করে সংস্থাটি।
টিটিডিসির বক্তব্য হচ্ছে, বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদের ঘাটতি নেই; বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সেগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যটকের জন্য সহজলভ্য, পরিচিত এবং পরিকল্পিত পর্যটন পণ্যে রূপান্তর করা।
প্রস্তাবিত রূপরেখার উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব এবং কোনগুলো সরকারি পর্যটন নীতিতে স্থান পাবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সূত্র: ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (টিটিডিসি), ‘Destination Bangladesh: A Blueprint for Tourism That Welcomes the World’