
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
বাংলাদেশ থেকে আরও কর্মী নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ইউরোপের দেশ গ্রিস। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে ২০২২ সালে স্বাক্ষরিত শ্রম অভিবাসনবিষয়ক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নবায়নের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছে দেশটি।
গ্রিসের অভিবাসনমন্ত্রী থানোস প্লেভরিসের সঙ্গে বৈঠকের পর এ তথ্য জানিয়েছেন দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনা।
বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে বৈধ পথে কর্মী নেওয়ার সুযোগ সম্প্রসারণ, অনিয়মিত অভিবাসন ও মানবপাচার প্রতিরোধ এবং শ্রম অভিবাসনে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বিশেষভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে কর্মী নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন গ্রিসের অভিবাসনমন্ত্রী।
গ্রিসের অভিবাসনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের ধারাবাহিকতায় বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদুল হকের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনা।
সেখানে বোয়েসেলের মাধ্যমে নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং তুলনামূলক কম খরচে বাংলাদেশি কর্মীদের গ্রিসে পাঠানোর প্রক্রিয়া কীভাবে দ্রুত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা কার্যকর হলে নিয়োগের বিভিন্ন ধাপে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নতুন ব্যবস্থায় কর্মীপ্রতি অভিবাসন ব্যয় কত হবে কিংবা কবে থেকে নিয়োগ শুরু হবে, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা আসেনি।
বাংলাদেশ ও গ্রিসের মধ্যে শ্রম অভিবাসন নিয়ে ২০২২ সালে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
ওই সমঝোতা অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ৪ হাজার কর্মী নেওয়ার সুযোগ তৈরির কথা ছিল। একই ব্যবস্থার আওতায় গ্রিসে আগে থেকেই অনিয়মিত অবস্থায় থাকা প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশিকে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় বৈধতার আওতায় আনার সুযোগ রাখা হয়েছিল।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রিসের অভিবাসনমন্ত্রী বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক নবায়নের বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন।
তবে এমওইউ নবায়নের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে এটিকে নতুন করে চার হাজার বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী নিয়োগের চূড়ান্ত ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
গ্রিসে কৃষি, পর্যটন, হোটেল-রেস্টুরেন্ট এবং নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে বিদেশি কর্মীর চাহিদা রয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে বৈধ শ্রম অভিবাসনের পথ আরও কার্যকর হলে এসব খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে কোন পেশায় কতজন বাংলাদেশি নেওয়া হবে, প্রয়োজনীয় দক্ষতা কী হবে, বেতন কত এবং কর্মীদের নিয়োগের প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে—এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক Job Order বা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিই চূড়ান্ত তথ্য দেবে।
তাই এখনই শুধু ‘গ্রিস কর্মী নিচ্ছে’—এমন প্রচারের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ দেওয়া নিরাপদ নয়।
রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, গ্রিসের অভিবাসনমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সফরটি অনুষ্ঠিত হলে শ্রম অভিবাসনবিষয়ক সমঝোতা নবায়ন, নতুন কর্মী নিয়োগ এবং বোয়েসেলের সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতার বিষয়গুলো আরও এগিয়ে যেতে পারে।
দুই দেশের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগব্যবস্থা শক্তিশালী হলে বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য ইউরোপে বৈধ কর্মসংস্থানের আরেকটি পথ সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
বৈধ কর্মী নিয়োগের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান জানালেও অনিয়মিত অভিবাসনের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন গ্রিসের অভিবাসনমন্ত্রী।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনিয়মিতভাবে গ্রিসে প্রবেশ করা ব্যক্তিরা শুধু আশ্রয়ের আবেদন করলেই সেখানে থাকার অনুমতি পাবেন—এমন সুযোগ থাকবে না বলে গ্রিক পক্ষ স্পষ্ট করেছে।
তবে কোনো ব্যক্তির আশ্রয় আবেদন বা আন্তর্জাতিক সুরক্ষার দাবি সংশ্লিষ্ট আইন ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী বিবেচিত হয়। বৈধ শ্রম অভিবাসন এবং আশ্রয় প্রক্রিয়া দুটি পৃথক বিষয়।
বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে নেওয়ার কথা বলে কিছু দালাল প্রথমে কর্মীদের উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে নিয়ে পরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিস বা অন্য ইউরোপীয় দেশে প্রবেশের চেষ্টা করায়।
এ ধরনের যাত্রায় আটক, প্রতারণা, নির্যাতন, অর্থ হারানো এবং সমুদ্রে প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে।
গ্রিস যদি বাংলাদেশ থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরও কর্মী নেওয়ার ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করে, তাহলে বৈধভাবে ইউরোপে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে অনিয়মিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাওয়ার প্রবণতা কমানোর ক্ষেত্রেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
২০২২ সালের সমঝোতা বাস্তবায়নে অন্যতম বাস্তব সমস্যা ছিল ভিসা প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশে গ্রিসের আবাসিক দূতাবাস না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে ভিসাসংক্রান্ত কার্যক্রম নয়াদিল্লিকেন্দ্রিক হওয়ায় আবেদনকারীদের অতিরিক্ত সময় ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
এ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে মধ্যস্থতাকারী বা দালালনির্ভরতার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
বোয়েসেলের মাধ্যমে সরাসরি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগব্যবস্থা কার্যকর হলে নিয়োগ থেকে ভিসা ও বিদেশযাত্রা পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি আরও সংগঠিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আনুষ্ঠানিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষা করা।
বোয়েসেলের মাধ্যমে গ্রিসে কর্মী নিয়োগ শুরু হলে চাকরির পদ, কর্মীর সংখ্যা, যোগ্যতা, বেতন, চুক্তির মেয়াদ, আবেদন পদ্ধতি এবং ব্যয়সহ বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ হওয়ার কথা।
এর আগে কেউ যদি ‘গ্রিসের ভিসা চালু হয়েছে’, ‘বোয়েসেলের কোটা পাওয়া গেছে’ অথবা ‘আগে টাকা দিলে নিশ্চিত ভিসা’—এমন দাবি করে অর্থ বা পাসপোর্ট চায়, তাহলে তা যাচাই ছাড়া দেওয়া উচিত নয়।
গ্রিসের বর্তমান আগ্রহ বাংলাদেশের জন্য নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে বাস্তবে কতজন কর্মী কবে থেকে যেতে পারবেন, সেটি নির্ভর করবে দুই দেশের পরবর্তী আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, এমওইউ নবায়ন এবং বাস্তব নিয়োগ কার্যক্রমের ওপর।
সূত্র: গ্রিসে বাংলাদেশ দূতাবাস, বোয়েসেল