
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজ থেকে প্রায় ১৯ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সম্ভাব্য সংঘবদ্ধ চক্রের বিষয়ে নতুন তথ্য সামনে আসছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রায় ৪০ কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণের চালানটি উড়োজাহাজ থেকে বের করার পরিকল্পনার সঙ্গে বিমানের প্রকৌশল বিভাগের চার কর্মীর সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সূত্রগুলো বলছে, ওই চার কর্মী বর্তমানে গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন। তদন্তে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
একই সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন কর্মকর্তাসহ আরও কয়েকজনের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে স্বর্ণ পাচারে জড়িত বা অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, দুবাই থেকে আসা উড়োজাহাজটি নিয়মিত কার্যক্রম শেষে হ্যাঙ্গারে নেওয়ার পর সুবিধাজনক সময়ে cargo hold থেকে স্বর্ণের চালানটি বের করার পরিকল্পনা ছিল।
তদন্তকারীরা সন্দেহ করছেন, বিমানবন্দরের স্বাভাবিক operational process-এর সুযোগ ব্যবহার করে চালানটি উড়োজাহাজ থেকে সরানোর চেষ্টা হতে পারে।
তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের আগেই গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।
তদন্তকারীরা এখন যাচাই করছেন—স্বর্ণগুলো কে বা কারা দুবাইয়ে উড়োজাহাজে তুলেছিল, বাংলাদেশে কার কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল এবং বিমানবন্দরের ভেতরে চালানটি বের করার জন্য কোনো অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল কি না।
গত ২ জুলাই দুবাই থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের cargo hold থেকে ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।
গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকারী একটি গোয়েন্দা সংস্থা, Aviation Security (AVSEC), কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নিরাপত্তা বিভাগের সমন্বয়ে অভিযানটি পরিচালিত হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
উদ্ধার করা স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪০ কোটি টাকা বলে প্রাথমিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে স্বর্ণের বাজারদর ও সরকারি মূল্যায়ন পদ্ধতির ওপর এর চূড়ান্ত আর্থিক মূল্য ভিন্ন হতে পারে।
তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে চলতি বছরের মার্চে সংঘটিত আরেকটি বড় স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনাও।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময়ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজ থেকে প্রায় ১৮ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছিল।
দুটি ঘটনায় স্বর্ণের পরিমাণ, রুট এবং পাচারের কথিত কৌশলে কিছু মিল পাওয়ার দাবি করছেন তদন্তকারীরা।
এ কারণে ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নাকি একই নেটওয়ার্কের ধারাবাহিক কার্যক্রম—সেটি যাচাই করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
তবে দুটি ঘটনার মধ্যে একই চক্রের সংশ্লিষ্টতা এখনো চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তদন্তে যোগাযোগ, দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি, flight movement, access information এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণের পর বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জুলাইয়ের চালানটি উড়োজাহাজ থেকে বের করার সম্ভাব্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রকৌশল বিভাগের চার কর্মীর ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
তাদের দায়িত্ব, সংশ্লিষ্ট উড়োজাহাজে প্রবেশের সুযোগ এবং ঘটনার সময় কে কোথায় দায়িত্ব পালন করছিলেন—এসব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি রাখা হয়েছে বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে কোনো কর্মীর উড়োজাহাজে প্রবেশের অনুমতি বা maintenance-related দায়িত্ব থাকা নিজে থেকে অপরাধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ নয়। তদন্তে প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা আলাদাভাবে প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে।
স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার ইন্সপেক্টর (অপারেশনস) শরিফ হোসেন সংশ্লিষ্ট ফ্লাইট পরিচালনা ও সেবার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা চেয়েছেন।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উড়োজাহাজ সরেজমিনে পরিদর্শনের অনুমতিও চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
ইন্সপেক্টর শরিফ হোসেন জানিয়েছেন, তদন্ত চলমান থাকায় এ পর্যায়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে মামলার তদন্তে শিগগিরই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসবে বলে তিনি আশা করছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকা পাওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অবতরণের পর শুধু যাত্রী ও ক্রুই উড়োজাহাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন না।
Ground handling, engineering, cleaning, catering, security, baggage এবং অন্যান্য operational service-এর প্রয়োজনে অনুমোদিত বিভিন্ন কর্মীর উড়োজাহাজের নির্দিষ্ট অংশে প্রবেশের প্রয়োজন হতে পারে।
ফলে তদন্তে কারা সংশ্লিষ্ট উড়োজাহাজে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিলেন, কখন পেয়েছিলেন এবং তাদের দায়িত্ব কী ছিল—এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এক্ষেত্রে duty roster-এর পাশাপাশি access-control record, CCTV footage, aircraft servicing information এবং সংশ্লিষ্ট operational documentation তদন্তে সহায়ক হতে পারে।
তবে কোন ধরনের তথ্য-প্রমাণ ইতোমধ্যে তদন্তকারীদের হাতে এসেছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নিরাপত্তায় শুধু যাত্রী বা বহিরাগত ব্যক্তির ঝুঁকি বিবেচনা করা হয় না। বৈধ access থাকা কোনো ব্যক্তির অনুমোদিত সুযোগের অপব্যবহারের সম্ভাবনাকেও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ ধরনের ঝুঁকি সাধারণভাবে insider threat হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিশেষ করে airside, aircraft, baggage handling area, cargo zone ও অন্যান্য restricted area-তে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে বড় ধরনের চোরাচালানের ঘটনায় শুধু উদ্ধার করা পণ্যের উৎস ও গন্তব্য নয়, বিমানবন্দরের restricted area-তে কারা কখন প্রবেশ করেছিলেন এবং সেই access-এর যৌক্তিকতা ছিল কি না—সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
দুবাই–ঢাকা বাংলাদেশের ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমান রুটগুলোর একটি। বিপুলসংখ্যক বৈধ যাত্রী, প্রবাসী ও ব্যবসায়ী নিয়মিত এ পথে চলাচল করেন।
একই কারণে এই রুটে কোনো চোরাচালানের ঘটনা ঘটলে সেটিকে সাধারণ যাত্রীপ্রবাহের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়।
কারা নির্দিষ্ট উড়োজাহাজ বা operational process-কে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে—সেটি intelligence-led investigation-এর মাধ্যমে আলাদাভাবে শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
এতে বৈধ যাত্রীদের অপ্রয়োজনীয় হয়রানি না বাড়িয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি, নেটওয়ার্ক ও কার্যক্রমকে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
প্রায় ১৯ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য শুধু জব্দ করা চালানের মালিক শনাক্ত করা নয়।
স্বর্ণ কোথা থেকে এসেছে, কার নির্দেশে উড়োজাহাজে রাখা হয়েছিল, ঢাকায় কার কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল এবং বিমানবন্দরের ভেতরে কোনো ব্যক্তি বা সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক সহযোগিতা করেছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।
একই সঙ্গে মার্চের স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনার সঙ্গে জুলাইয়ের ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
যদি তদন্তে একই ধরনের একাধিক ঘটনার মধ্যে সাংগঠনিক যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে বিষয়টি বিচ্ছিন্ন চোরাচালান প্রচেষ্টার পরিবর্তে বৃহত্তর নেটওয়ার্কের দিকে তদন্তকে নিয়ে যেতে পারে।
অন্যদিকে এমন প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত দুই ঘটনাকে একই চক্রের কাজ হিসেবে নিশ্চিতভাবে উপস্থাপন করাও সমীচীন হবে না।
এই ঘটনায় বিমানের প্রকৌশল বিভাগের কর্মী ও একজন কর্মকর্তার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার তথ্য তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে পাওয়া গেলেও তদন্ত এখনো চলমান।
কাউকে এখনো আদালত স্বর্ণ পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেনি।
তাই নজরদারিতে থাকা, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তালিকাভুক্ত হওয়া কিংবা কোনো ফ্লাইটে দায়িত্ব পালন করা—এর কোনোটিই নিজে থেকে অপরাধ প্রমাণ করে না।
তদন্ত শেষে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই নির্ধারণ করবে কার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হবে এবং কার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার মতো প্রমাণ রয়েছে।
প্রায় ১৯ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের এই ঘটনার পূর্ণ চিত্র তাই তদন্ত শেষ হওয়ার পরই পরিষ্কার হবে। বিশেষ করে বিমানবন্দরের restricted area ও উড়োজাহাজে বৈধ প্রবেশাধিকার কোনো চোরাচালান চক্র অপব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল কি না—সেটিই তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে।
সূত্র: বিমানবন্দর