
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে হংকং থেকে আসা ফলের চালান থেকে ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধারের পর বড় একটি চোরাচালান নেটওয়ার্কের তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। একই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নামে গত এক বছরে অন্তত ১০টি ফলের চালান আসার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব চালানেও একই কৌশলে স্বর্ণ আনা হয়েছিল কি না, তা এখন খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা ও শুল্ক কর্তৃপক্ষ।
গত ১৯ জুলাই হংকং থেকে আসা একটি ফলের চালানে অভিযান চালিয়ে ১৬ কেজি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে ডিজিএফআই ও ঢাকা কাস্টমস হাউসের যৌথ দল। সংশ্লিষ্ট নথিতে চালানটির আমদানিকারক হিসেবে ‘ফুড লিংক’ (Food Link)-এর নাম পাওয়া যায়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ফলের ক্যারেটের মধ্যে বিশেষভাবে তৈরি গোপন প্রকোষ্ঠে স্বর্ণের বার লুকিয়ে আনা হয়েছিল। কাগজপত্রে চালানটিকে ফল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
তদন্তকারীদের সন্দেহ, একই পদ্ধতি ব্যবহার করে এর আগেও হংকং থেকে বাংলাদেশে স্বর্ণ আনা হয়ে থাকতে পারে। বৈধ পণ্য আমদানির নথি ব্যবহার করায় চালানগুলো কার্গো ক্লিয়ারেন্সের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে পেরেছিল বলে তাদের ধারণা।
তদন্তে পাওয়া নথি অনুযায়ী, Food Link-এর নামে গত এক বছরে হংকং থেকে অন্তত ১০টি ফলের চালান বাংলাদেশে এসেছে। এখন প্রতিটি চালানের তথ্য নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, আগের চালানগুলোতেও উদ্ধার হওয়া চালানের মতো একই পদ্ধতিতে স্বর্ণ বহন করা হয়ে থাকলে মোট পরিমাণ প্রায় ২৫০ কেজি এবং এর মূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হতে পারে।
তবে তদন্তকারীরা এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি যে আগের সব চালানেই স্বর্ণ ছিল। ফলে ২৫০ কেজি স্বর্ণ পাচারের বিষয়টি এখন পর্যন্ত একটি তদন্তভিত্তিক অনুমান, প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়।
ঢাকা কাস্টমস হাউসের কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, তদন্তে এখন পর্যন্ত কয়েকটি সন্দেহজনক চালান শনাক্ত হয়েছে। হংকং থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো রুট ব্যবহার করে স্বর্ণ আনার একটি নতুন পদ্ধতি তৈরি হয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, বড় আকারের কার্গো চালান শতভাগ পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে চোরাচালানকারীরা কাজে লাগিয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের বিষয়।
তদন্তে Food Link-এর নিবন্ধিত ঠিকানা নিয়েও অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তকারীরা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে প্রত্যাশিত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অস্তিত্ব পাননি।
স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় Food Link-এর স্বত্বাধিকারী মো. গোলাম মোস্তফাকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। একই সঙ্গে অজ্ঞাতনামা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগগুলো বর্তমানে তদন্তাধীন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
উদ্ধার হওয়া চালানের নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এটি খালাসের জন্য A. Razzaque Trading নামে একটি C&F এজেন্টকে ASYCUDA World-এ ট্যাগ করা ছিল। সংশ্লিষ্ট নথিতে Fastrack Cargo Solutions Ltd.-এর নামও পাওয়া গেছে।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম একটি চালানের পরিবহন বা ক্লিয়ারেন্স নথিতে থাকা মানেই প্রতিষ্ঠানটি চোরাচালানে জড়িত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ছিল কি না, সেটি তদন্তের বিষয়।
তদন্তকারীরা এখন আমদানিকারক, কার্গো এজেন্ট, C&F কার্যক্রম এবং চালান খালাসের বিভিন্ন পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা পরীক্ষা করছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে সপ্তাহে ১৬ কেজি স্বর্ণের চালানটি আটক করা হয়, একই সময়ে একই ধরনের আরেকটি ফলের চালান খালাস হয়েছিল।
এ কারণে জব্দ হওয়া ১৬ কেজি স্বর্ণের চালানটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি বড় চোরাচালান ব্যবস্থার অংশ—সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
ঘটনাটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো নিরাপত্তা, স্ক্যানিং সক্ষমতা এবং আমদানি পণ্য যাচাই প্রক্রিয়াকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
যাত্রী টার্মিনালের নিরাপত্তার তুলনায় আন্তর্জাতিক এয়ার কার্গোর প্রক্রিয়া অনেক বেশি জটিল। একটি চালান বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর এয়ারলাইন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার, কার্গো এজেন্ট, C&F এজেন্ট, কাস্টমস এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষ বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করে।
ফলে বৈধ বাণিজ্যিক চালানের মধ্যে নিষিদ্ধ বা অঘোষিত পণ্য লুকিয়ে আনার চেষ্টা ঠেকাতে কার্যকর গোয়েন্দা তথ্যের পাশাপাশি আধুনিক স্ক্যানিং প্রযুক্তি, ঝুঁকিভিত্তিক কার্গো প্রোফাইলিং এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ।
বেবিচকের পক্ষ থেকে অবশ্য কার্গো ভিলেজে নিরাপত্তা দুর্বল থাকার অভিযোগ নাকচ করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, বিমানবন্দরের নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয় নজরদারির মধ্যে রয়েছে এবং কার্গো এলাকায় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে।
গত এক বছরে Food Link-এর নামে আসা চালানগুলোর তথ্য পুনরায় পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আগের চালানগুলোতে আসলে কী ছিল, সেগুলো কীভাবে খালাস হয়েছিল এবং একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বারবার এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পরই হংকং থেকে ফল আমদানির আড়ালে স্বর্ণ চোরাচালানের সন্দেহভাজন নেটওয়ার্কটি কতটা বিস্তৃত ছিল তা স্পষ্ট হতে পারে।
এখন পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য হলো, Food Link-এর নামে হংকং থেকে আসা একটি ফলের চালান থেকে ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার হয়েছে এবং একই প্রতিষ্ঠানের নামে গত এক বছরে অন্তত ১০টি ফলের চালান আসার তথ্য তদন্তকারীরা পেয়েছেন। বাকি চালানগুলোতে স্বর্ণ ছিল কি না এবং সম্ভাব্য চোরাচালানের মোট পরিমাণ কত—তা এখনো তদন্তাধীন।
সূত্র: ঢাকা কাস্টমস হাউস