
দীর্ঘদিনের অবহেলা, দখলদারিত্ব ও জরাজীর্ণতা কাটিয়ে নতুন রূপে ফিরেছে পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক লালকুঠি বা নর্থব্রুক হল। সংস্কারের পর প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো এই স্থাপনা এখন ইতিহাসপ্রেমী, শিক্ষার্থী, ভ্রমণপিপাসু ও পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের আকর্ষণের নতুন কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর মধ্যে লালকুঠির স্থাপত্য ও ইতিহাস দুটিই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৮০ সালে নির্মিত ভবনটি একসময় পুরান ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। নাটক, সাহিত্যসভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন সামাজিক আয়োজন হতো এখানে।
দীর্ঘ সময় যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ভবনটির সৌন্দর্য ও ব্যবহারযোগ্যতা কমে গেলেও সংস্কারের পর আবারও দৃশ্যমান হয়েছে এর ঐতিহাসিক স্থাপত্যশৈলী।
বুড়িগঙ্গা নদীর কাছাকাছি পুরান ঢাকায় অবস্থিত নর্থব্রুক হল তার লাল রঙের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে ‘লালকুঠি’ নামেই বেশি পরিচিত।
ঔপনিবেশিক আমলের ঢাকার স্থাপত্য ইতিহাসে ভবনটির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। এর স্থাপত্যে ইউরোপীয় নকশার সঙ্গে তৎকালীন উপমহাদেশীয় অলংকরণের প্রভাবও দেখা যায়।
একসময় এটি শুধু একটি ভবন ছিল না; বরং পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মিলনকেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
ঐতিহাসিকভাবে ভবনটির সঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিও জড়িয়ে রয়েছে। ১৯২৬ সালে ঢাকা সফরের সময় এখানে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
ফলে লালকুঠির গুরুত্ব শুধু স্থাপত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বাংলাদেশের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ঐতিহাসিক স্থাপনাটির সংস্কার ও সংরক্ষণকাজ করা হয়েছে।
সংস্কারের ক্ষেত্রে পুরোনো স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ন রেখে ভবনটির সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাঙ্গণকে দর্শনার্থীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় ও ব্যবহারোপযোগী করে তোলা হয়েছে।
এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা আড়ালে থাকা লালকুঠি আবারও পুরান ঢাকার দর্শনীয় স্থানের তালিকায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, সংস্কারের পর এখানে দর্শনার্থীর উপস্থিতিও বেড়েছে। বিশেষ করে ছুটির দিনে তরুণ-তরুণী, শিক্ষার্থী ও পরিবার নিয়ে অনেকেই ঐতিহাসিক ভবনটি দেখতে আসছেন।
লালকুঠির পুনরুদ্ধার ঢাকার heritage tourism বা ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
পুরান ঢাকার তুলনামূলক ছোট একটি এলাকার মধ্যেই আহসান মঞ্জিল, লালকুঠি, আর্মেনিয়ান চার্চ, তারা মসজিদ, শাঁখারীবাজার, বাহাদুর শাহ পার্ক এবং বুড়িগঙ্গাকেন্দ্রিক বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে।
এসব স্থানকে বিচ্ছিন্ন পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে না দেখে পরিকল্পিত একটি Old Dhaka Heritage Circuit-এর আওতায় আনা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য কয়েক ঘণ্টা বা এক দিনের পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা তৈরি করা সম্ভব।
এতে ঐতিহাসিক স্থাপনার পাশাপাশি পুরান ঢাকার খাবার, হস্তশিল্প, নদীকেন্দ্রিক ইতিহাস এবং স্থানীয় সংস্কৃতিকেও পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
ঢাকায় আসা অনেক বিদেশি পর্যটক ও ব্যবসায়িক ভ্রমণকারী স্বল্প সময়ের জন্য রাজধানীতে অবস্থান করেন। তাদের জন্য শহরের ইতিহাস ও সংস্কৃতি দেখার সহজ এবং সুসংগঠিত ব্যবস্থা থাকলে পুরান ঢাকা গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন পণ্য হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশকারী বিদেশি পর্যটকদের কাছে ঢাকা শুধু একটি transit point না হয়ে নিজেই একটি cultural destination হিসেবে পরিচিত হতে পারে।
এজন্য শুধু ঐতিহাসিক ভবন সংস্কার করলেই হবে না। পর্যটন তথ্য, ইংরেজিসহ একাধিক ভাষায় তথ্যফলক, প্রশিক্ষিত গাইড, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, হাঁটার উপযোগী পথ এবং সহজ পরিবহনব্যবস্থাও প্রয়োজন।
লালকুঠির ইতিহাস ডিজিটাল QR code বা audio guide-এর মাধ্যমে তুলে ধরার ব্যবস্থা করা গেলে বিদেশি ও তরুণ দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।
ঐতিহাসিক স্থাপনা সংস্কারের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ।
একবার বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে ভবন সংস্কার করার পর নিয়মিত পরিচর্যা না হলে কয়েক বছরের মধ্যেই আবার ক্ষয়ক্ষতি শুরু হতে পারে।
এ কারণে দর্শনার্থীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, ভবনের সংবেদনশীল অংশ সুরক্ষা, নিয়মিত কাঠামোগত পরীক্ষা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং আশপাশে অনিয়ন্ত্রিত স্থাপনা বা দখল ঠেকানোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে জনপ্রিয় হওয়ার কারণে যেন মূল স্থাপত্যের ক্ষতি না হয়, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্য কোনো পুরোনো ভবনকে শুধু সুন্দর করে পর্যটকদের ছবি তোলার জায়গায় পরিণত করা নয়।
একটি ঐতিহাসিক স্থাপনার নির্মাণকাল, স্থাপত্যশৈলী, সেখানে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং সংশ্লিষ্ট মানুষের ইতিহাস দর্শনার্থীদের সামনে সঠিকভাবে তুলে ধরাও সংরক্ষণের অংশ।
লালকুঠিতে একটি ছোট heritage interpretation centre, পুরোনো আলোকচিত্রের প্রদর্শনী অথবা ডিজিটাল আর্কাইভ যুক্ত করা গেলে দর্শনার্থীরা ভবনটির ইতিহাস আরও ভালোভাবে জানতে পারবেন।
এতে পর্যটনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্যও স্থানটি একটি কার্যকর শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
পরিকল্পিত heritage tourism স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ঐতিহাসিক এলাকা দেখতে দর্শনার্থী বাড়লে স্থানীয় রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প, পরিবহন ও পর্যটক গাইডের মতো বিভিন্ন সেবার চাহিদা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে পর্যটন সম্প্রসারণ যেন স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এবং ঐতিহাসিক এলাকার পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি না করে, সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন।
লালকুঠির নতুন রূপ দেশের অন্য জরাজীর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় শত বছরের পুরোনো জমিদারবাড়ি, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, ঔপনিবেশিক ভবন এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা রয়েছে। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে এর অনেকগুলোই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, লালকুঠির মতো এসব ঐতিহাসিক স্থাপনাও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হবে।
ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ, তার ইতিহাস যথাযথভাবে উপস্থাপন এবং পরিকল্পিত পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে একই সঙ্গে তিনটি উদ্দেশ্য পূরণ হতে পারে—ঐতিহ্য রক্ষা, নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করা এবং পর্যটন অর্থনীতির নতুন সুযোগ তৈরি করা।
নতুন রূপে ফেরা লালকুঠি তাই শুধু একটি পুরোনো ভবনের সংস্কারের গল্প নয়; এটি পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে পুরান ঢাকাকে একটি সমৃদ্ধ heritage tourism destination হিসেবে তুলে ধরার বড় সুযোগও হতে পারে।
সূত্র: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন-সংশ্লিষ্ট তথ্য ও লালকুঠি/নর্থব্রুক হলের প্রকাশিত ঐতিহাসিক বিবরণ