
বাংলাদেশের জন্য ভ্রমণ সতর্কতার মাত্রা কমিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশকে Level 3—‘Reconsider Travel’ থেকে Level 2—‘Exercise Increased Caution’ পর্যায়ে নামিয়েছে। নতুন নির্দেশনা কার্যকর হয়েছে ৩০ জুলাই ২০২৬ থেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি Travel Advisory অনুযায়ী, এর আগে গত ২০ জানুয়ারি বাংলাদেশ Level 3-এ ছিল। নতুন মূল্যায়নে সামগ্রিক সতর্কতার মাত্রা এক ধাপ কমানো হলেও বাংলাদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে মার্কিন নাগরিকদের এখনও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ পরিবর্তনকে দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়নে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছে।
যুক্তরাষ্ট্রের Travel Advisory ব্যবস্থায় Level 2—Exercise Increased Caution অর্থ হলো, সংশ্লিষ্ট দেশে ভ্রমণ করা যাবে, তবে স্বাভাবিকের তুলনায় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে অস্থিরতা, অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ এবং অপহরণ বা জিম্মি হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখ করেছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, Travel Advisory Level কমে যাওয়ার অর্থ বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত ঘোষণা করা নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নির্দেশনায় বাংলাদেশের কিছু এলাকার জন্য আরও কঠোর সতর্কতা বহাল রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নির্দেশনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে অস্থিরতা, অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ ও অপহরণের ঝুঁকির কারণে মার্কিন নাগরিকদের ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন এলাকা এবং কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরসংলগ্ন এলাকাতেও অস্থিরতা, অপরাধ ও অপহরণের ঝুঁকির কারণে ভ্রমণ না করার নির্দেশনা রয়েছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ের Travel Advisory Level 2 হলেও নির্দিষ্ট কিছু এলাকার ঝুঁকির মাত্রা আলাদাভাবে বেশি বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৩১ জুলাই এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে Travel Advisory পরিবর্তনের বিষয়টি জানায়।
মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ঢাকায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিও গর-এর মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পরপরই সিদ্ধান্তটির বিষয়ে বাংলাদেশকে জানানো হয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ সরকার Travel Advisory Level কমানোর সিদ্ধান্তকে দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদারে নেওয়া পদক্ষেপের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখছে।
কোনো দেশের Travel Advisory বিদেশি পর্যটকের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ট্যুর অপারেটর, করপোরেট ট্রাভেলার এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ভ্রমণনীতি তৈরির সময় সরকারি নিরাপত্তা নির্দেশনা বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
Level 3-এর ‘Reconsider Travel’ নির্দেশনা সম্ভাব্য ভ্রমণকারীর কাছে তুলনামূলক কঠোর সতর্কবার্তা দেয়। Level 2-এ নেমে আসায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই সামগ্রিক সতর্কতার মাত্রা কমেছে।
ফলে বাংলাদেশের পর্যটন খাতের আন্তর্জাতিক প্রচারণায় এটি একটি ইতিবাচক তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে বিদেশি পর্যটক বাড়াতে শুধু Travel Advisory পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। সহজ ভিসা ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক প্রচারণা, পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তা, উন্নত যোগাযোগ এবং মানসম্মত পর্যটনসেবাও গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও Travel Advisory পরিবর্তন হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন ফ্লাইট চালু হয় না।
এয়ারলাইনস নতুন রুট চালুর আগে যাত্রী চাহিদা, দ্বিপক্ষীয় বিমান চলাচল অধিকার, বিমানবন্দর সক্ষমতা, পরিচালন ব্যয়, ট্রানজিট বাজার এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে।
তবে কোনো গন্তব্য সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ কমলে ব্যবসায়িক ও অবকাশযাপনমূলক ভ্রমণের চাহিদায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। যাত্রী চাহিদা বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে সেটি বিমান যোগাযোগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে।
আন্তর্জাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানির কর্মীদের বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে অনেক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিরাপত্তা নীতি থাকে। কোনো দেশের সরকারি Travel Advisory এসব সিদ্ধান্তে একটি বিবেচ্য বিষয় হতে পারে।
ফলে বাংলাদেশের সামগ্রিক Travel Advisory Level কমে আসা ব্যবসায়িক ভ্রমণের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে।
তবে এর ফলে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বেই—এমন নিশ্চয়তা নেই। বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা, ব্যবসার পরিবেশ, অবকাঠামো এবং বাজার সম্ভাবনাসহ আরও অনেক বিষয় বিবেচিত হয়।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ এবং দেশকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় Travel Advisory এক ধাপ কমে আসাকে আন্তর্জাতিক প্রচারণায় কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মূল্যায়নের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রকৃতি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পর্যটন পণ্য নিয়ে পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক প্রচারণা যুক্ত করা গেলে দেশের পর্যটন ব্র্যান্ডিংয়ে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি হতে পারে।
তবে পর্যটকদের কাছে সঠিক তথ্য তুলে ধরাও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় পর্যায়ে Level 2 হওয়া যেমন ইতিবাচক পরিবর্তন, তেমনি যেসব অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র এখনও ভ্রমণ না করার নির্দেশনা রেখেছে, সেসব তথ্যও স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন।
সর্বশেষ পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের Level 2—Exercise Increased Caution শ্রেণিতে রয়েছে। ভবিষ্যতে এই অবস্থান আরও উন্নত করতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির ধারাবাহিক উন্নতির পাশাপাশি পর্যটকবান্ধব পরিবেশ, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও গন্তব্য ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের Travel Advisory এবং বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য