
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্যে পৌঁছেছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক আলোচনার পর বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত ৩০ জুলাই কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদি আমিন জানিয়েছিলেন, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা গেলে আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের মালয়েশিয়ায় পাঠানো শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে ২৮ আগস্ট প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানায়, শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার কর্মীকে ‘শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে’ নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে মালয়েশিয়া।
কুয়ালালামপুরে সংবাদ সম্মেলনে মাহদি আমিন বলেছিলেন, দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের আলোচনায় শ্রমবাজার পুনরায় চালু, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে।
সেই সময় তিনি আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে নতুন কর্মীদের মালয়েশিয়ায় পাঠানো শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণের কথা জানান।
সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (BOESL)-কে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বল্প খরচে কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
তবে ‘আগস্টের শেষ সপ্তাহ’ ছিল বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা। এটিকে সব কর্মীর জন্য ওই সময় থেকেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ চালু হওয়ার ঘোষণা হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
৩০ জুলাইয়ের ঘোষণার পর দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকে।
২৮ আগস্ট প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশের অনুরোধে প্রাথমিকভাবে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে zero-cost বা শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে নিয়োগে সম্মতি দিয়েছে মালয়েশিয়া।
প্রথম দফার এসব কর্মীকে BOESL-এর মাধ্যমে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইট ব্যবহারের কথাও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ কর্মীদের বিমানভাড়া বা অন্যান্য অভিবাসন-সংশ্লিষ্ট ব্যয় বহন করতে হবে না।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে আগের বিভিন্ন অভিযোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।
বিশেষ করে মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব কমানো, কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বৈধ ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
আগের নিয়োগ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, সিন্ডিকেট, অনিয়ম এবং কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল। এসব সমস্যা সমাধান করে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করার কথা বলেছে সরকার।
পরবর্তী সরকারি তথ্যে জানানো হয়, মালয়েশিয়া সরাসরি বাংলাদেশের ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচন করেছে।
এর পাশাপাশি আরও ৩১২টি প্রতিষ্ঠানকে সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সি হিসেবে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার উচ্চপর্যায়ের একটি যৌথ কমিটি এসব এজেন্সি যাচাই-বাছাই করেছে। কমিটিতে দেশটির সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার প্রতিনিধিরা ছিলেন। এজেন্সি নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের সম্পৃক্ততা ছিল না বলে জানানো হয়েছে।
মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ পুনরায় শুরুর খবরের পর চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ দেওয়া উচিত নয়।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ও স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিক নোটিশ না আসা পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে টাকা না দিতে, মেডিকেল পরীক্ষা না করাতে এবং পাসপোর্ট জমা না দিতে।
ফলে কোনো দালাল বা মধ্যস্থতাকারী যদি ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলে গেছে’, ‘আগে টাকা দিলে প্রথম ব্যাচে পাঠানো হবে’, ‘১০ হাজার ফ্রি ভিসার তালিকায় নাম দেওয়া হবে’ অথবা ‘নিশ্চিত ওয়ার্ক পারমিট’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে সরকারি তথ্য ছাড়া সেই দাবি বিশ্বাস করা ঝুঁকিপূর্ণ।
মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহী কর্মীদের সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের জন্য অপেক্ষা করাই নিরাপদ।
নির্দিষ্ট চাকরির পদ, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, বেতন, চুক্তির মেয়াদ, কর্মঘণ্টা, আবাসন, অভিবাসন ব্যয় এবং কোন প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে হবে—এসব তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পরই আবেদন করা উচিত।
বিশেষ করে BOESL-এর মাধ্যমে প্রথম দফার ১০ হাজার কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে আবেদনপদ্ধতি ও যোগ্যতা সম্পর্কে BOESL এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশি কর্মীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি শ্রমবাজার। নির্মাণ, উৎপাদন, সেবা, কৃষি ও অন্যান্য খাতে দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন।
২০২৪ সালের ৩১ মে নির্ধারিত সময়ের পর নতুন বিদেশি কর্মীদের প্রবেশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ থেকে নতুন কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
এরপর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে একাধিক দফা আলোচনায় শ্রমবাজার পুনরায় চালু, অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। এপ্রিলে দুই দেশ sector-specific demand-এর ভিত্তিতে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছিল।
৩০ জুলাইয়ের ঘোষণায় আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা সামনে আসে এবং ২৮ আগস্টের সরকারি ঘোষণায় ১০ হাজার কর্মীকে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে পাঠানোর পরিকল্পনা আরও স্পষ্ট হয়।
ফলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির প্রক্রিয়া এগোলেও চাকরিপ্রত্যাশীদের সরকারি বিজ্ঞপ্তি ছাড়া অর্থ প্রদান, মেডিকেল পরীক্ষা বা পাসপোর্ট জমা না দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)