
এভিয়েশন বার্তা বিশেষ প্রতিবেদন
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত তৃতীয় টার্মিনাল আগামী ১৬ ডিসেম্বর উদ্বোধনের লক্ষ্য সামনে রেখে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক, কারিগরি ও পরিচালনাগত জটিলতা পেরিয়ে টার্মিনালটি অপারেশনে আনতে সরকার এবং বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এখন বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সমন্বয়ের কাজ করছে।
ঠিক এই সময়ে তৃতীয় টার্মিনাল নিয়ে গণমাধ্যমে একের পর এক সমালোচনামূলক প্রতিবেদনও সামনে আসছে। এসব প্রতিবেদনের কিছুতে অতীতের নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণ, পুরোনো নথি কিংবা আগে আলোচিত বিভিন্ন বিষয় নতুন করে তুলে ধরা হচ্ছে।
বৃহৎ রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের ব্যয়, নির্মাণকাজ, ক্রয়প্রক্রিয়া কিংবা পরিচালনাগত প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা গণমাধ্যমের স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একই সঙ্গে পুরোনো কোনো তথ্য বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রকাশ করা হলে সেই বিষয়ে সর্বশেষ অবস্থা, কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা এবং এর মধ্যে কী পরিবর্তন হয়েছে—সেটিও পাঠকের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।
কোনো নিরীক্ষা আপত্তি বা পুরোনো নথির তথ্য শুধু পুরোনো হওয়ার কারণে গুরুত্বহীন হয়ে যায় না। সংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধান না হয়ে থাকলে সেটি বর্তমানেও প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
কিন্তু একটি পুরোনো পর্যবেক্ষণকে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—আপত্তিটি এখনো বহাল আছে কি না, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী জবাব দিয়েছে, এর পর কোনো সংশোধনী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না এবং বর্তমান বাস্তবতা কী।
এসব তথ্য ছাড়া শুধু অতীতের পর্যবেক্ষণ সামনে এলে পাঠকের পক্ষে প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা থাকলেই কোনো অভিযোগ বা নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণ অকার্যকর হয়ে যায় না। উভয় পক্ষের তথ্য পাশাপাশি যাচাই করাই ভারসাম্যপূর্ণ সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি।
তৃতীয় টার্মিনালকে ঘিরে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এর অপারেশনাল প্রস্তুতি।
১৬ ডিসেম্বর উদ্বোধনের লক্ষ্য সামনে রেখে টার্মিনালের বিভিন্ন ব্যবস্থা পরীক্ষা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং পরিচালনাগত প্রস্তুতির কাজ চলছে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—১৬ ডিসেম্বর এখন একটি ঘোষিত লক্ষ্য। টার্মিনালের সব কার্যক্রম একই দিনে পূর্ণ সক্ষমতায় শুরু হবে কি না, সেটি চূড়ান্ত পরিচালনাগত প্রস্তুতি ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
তাই উদ্বোধনের লক্ষ্য এবং পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক অপারেশন—দুটিকে একই বিষয় হিসেবে উপস্থাপন না করাই যথাযথ।
তৃতীয় টার্মিনালকে শুধু নতুন একটি টার্মিনাল ভবন হিসেবে দেখলে প্রকল্পটির সামগ্রিক গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না।
এটি চালু হলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি চেক-ইন, ইমিগ্রেশন, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, নিরাপত্তা, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে শাহজালাল বিমানবন্দরের সক্ষমতা দেশের পর্যটন, ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
তাই তৃতীয় টার্মিনালের সফলতা শুধু এর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাস্তবে যাত্রীরা কত দ্রুত ও মানসম্মত সেবা পাচ্ছেন, এয়ারলাইন্সগুলোর অপারেশন কতটা সহজ হচ্ছে এবং বিমানবন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা কতটা বাড়ছে—সেটিই হবে প্রকল্পটির বড় পরীক্ষা।
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রকল্প সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। বরং জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত বড় প্রকল্পে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, নিরীক্ষা এবং প্রশ্ন তোলা জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কোনো অনিয়ম, ব্যয়ের অসংগতি, কারিগরি দুর্বলতা বা ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা থাকলে সেটি তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকাশ হওয়া প্রয়োজন।
একইভাবে কোনো পুরোনো সমস্যার সমাধান হয়ে থাকলে, কোনো নিরীক্ষা আপত্তির জবাব দেওয়া হলে অথবা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটলে সেই হালনাগাদ তথ্যও পাঠকের জানা প্রয়োজন।
অর্থাৎ সমালোচনা আড়াল করা যেমন জনস্বার্থের পরিপন্থী, তেমনি বর্তমান বাস্তবতা বাদ দিয়ে পুরোনো তথ্যকে নতুন ঘটনার মতো উপস্থাপন করাও পূর্ণাঙ্গ চিত্র দেয় না।
তৃতীয় টার্মিনাল নিয়ে ইতিবাচক প্রচার কিংবা নেতিবাচক সমালোচনা—কোনোটিই শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটির সফলতার চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়।
আসল পরীক্ষা শুরু হবে যাত্রীসেবা চালুর পর।
যাত্রী কত দ্রুত ইমিগ্রেশন শেষ করতে পারছেন, ব্যাগেজ পেতে কত সময় লাগছে, নিরাপত্তা কতটা কার্যকর, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কতটা দক্ষ, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা বাস্তবে নিশ্চিত হচ্ছে কি না—এসব দিয়েই তৃতীয় টার্মিনালের কার্যকারিতা বিচার হবে।
১৬ ডিসেম্বরকে সামনে রেখে তাই এখন প্রয়োজন স্বচ্ছ তথ্য, বাস্তব অগ্রগতির নিয়মিত প্রকাশ এবং সমস্যাগুলো থাকলে সেগুলোরও স্পষ্ট স্বীকৃতি ও সমাধান।
তৃতীয় টার্মিনাল বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। এর সাফল্য যেমন তুলে ধরা প্রয়োজন, তেমনি দুর্বলতা ও ব্যর্থতার ক্ষেত্রেও প্রশ্ন থাকা প্রয়োজন।
কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো প্রকল্পের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নয়—হালনাগাদ, যাচাইযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ তথ্যের ভিত্তিতে জনগণকে প্রকৃত চিত্র জানানোই হওয়া উচিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সূত্র: তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্প ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এভিয়েশন বার্তার বিশ্লেষণ