
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালে নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করতে বড় পরিসরে ইনডোর টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তুলতে যাচ্ছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, টার্মিনালজুড়ে Active Distributed Antenna System (Active DAS), ৭০০টি স্মল সেল এবং ৬৩৫টি Wi-Fi Access Point স্থাপন করা হবে।
প্রায় ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড। ভবিষ্যতের ৫জি প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামোটি তৈরি করা হচ্ছে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, থার্ড টার্মিনালের গুরুত্বপূর্ণ ইনডোর এলাকাগুলো নতুন নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হবে।
এর মধ্যে রয়েছে ইমিগ্রেশন এলাকা, চেক-ইন কাউন্টার, ভিআইপি লাউঞ্জ, এক্সপোর্ট কার্গো টার্মিনাল (ECT), ইমপোর্ট কার্গো টার্মিনাল (ICT) এবং যাত্রী ও বিমানবন্দর কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
নতুন অবকাঠামোর লক্ষ্য এসব এলাকায় একই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন ভয়েস কল এবং উচ্চগতির ডেটা সংযোগ নিশ্চিত করা।
সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক মূলত ভবনের বাইরে স্থাপিত টাওয়ার বা বেস স্টেশনের সিগন্যালের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বড় বিমানবন্দর টার্মিনালে স্টিল, কংক্রিট, বিশেষ ধরনের কাচ ও বিস্তৃত ইনডোর কাঠামোর কারণে বাইরের মোবাইল সিগন্যাল ভবনের সব জায়গায় একই শক্তিতে পৌঁছাতে পারে না।
বিশেষ করে ইমিগ্রেশন হল, ব্যাগেজ এলাকা, লাউঞ্জ, করিডর কিংবা ভবনের ভেতরের অংশে সিগন্যাল দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
Distributed Antenna System বা DAS এই সমস্যার সমাধানে একটি কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক থেকে ভবনের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত অ্যান্টেনার মাধ্যমে সিগন্যাল বিতরণ করে। এর সঙ্গে স্মল সেল যুক্ত হলে বেশি যাত্রী বা ব্যবহারকারী থাকা এলাকাতেও নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হয়।
ফলে টার্মিনালের বিভিন্ন অংশে দুর্বল সিগন্যাল, কল ড্রপ এবং ধীরগতির মোবাইল ডেটার সমস্যা কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, থার্ড টার্মিনালে মোট ৭০০টি স্মল সেল স্থাপন করা হবে।
স্মল সেল মূলত স্বল্প দূরত্বে উচ্চক্ষমতার মোবাইল সংযোগ দিতে ব্যবহৃত ছোট আকারের সেলুলার নেটওয়ার্ক ইউনিট। বিমানবন্দরের মতো একই সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেন—এমন স্থানে এগুলো নেটওয়ার্কের ধারণক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ফলে ব্যস্ত সময়ে হাজারো যাত্রী একই সঙ্গে ফোনকল, মেসেজিং, ভিডিও কল, অনলাইন চেক-ইন কিংবা ইন্টারনেটভিত্তিক অন্যান্য সেবা ব্যবহার করলেও নেটওয়ার্কের ওপর চাপ সামলানো সহজ হবে।
মোবাইল নেটওয়ার্কের পাশাপাশি থার্ড টার্মিনালে ৬৩৫টি Wi-Fi Access Point স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বড় একটি বিমানবন্দর টার্মিনালে Wi-Fi শুধু যাত্রীদের ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়। এয়ারলাইন কার্যক্রম, গ্রাউন্ড অপারেশন, ডিজিটাল যাত্রীসেবা এবং বিভিন্ন বিমানবন্দরভিত্তিক কার্যক্রমেও নির্ভরযোগ্য ডেটা সংযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পর্যাপ্ত সংখ্যক অ্যাক্সেস পয়েন্ট থাকলে পুরো টার্মিনালজুড়ে Wi-Fi coverage এবং একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীকে সংযুক্ত রাখার সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
নতুন টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এটি ৫জি প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে নির্মাণের পরিকল্পনা।
বিশ্বের আধুনিক বিমানবন্দরগুলোতে দ্রুতগতির যোগাযোগ অবকাঠামো শুধু যাত্রীদের ইন্টারনেট ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নেই। ভবিষ্যতে Internet of Things (IoT), smart baggage handling, connected airport equipment, real-time operational data এবং বিভিন্ন স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল সেবা পরিচালনায় শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
থার্ড টার্মিনালে ৫জি-সমর্থিত অবকাঠামো থাকলে ভবিষ্যতে এ ধরনের নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করার ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।
এর মধ্যে টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ৪৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। বিদ্যুৎ, পরিবহন, প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণসহ পরিচালন ব্যয়ের জন্য প্রায় ২ কোটি ২৪ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ভৌত ও মূল্য সমন্বয়ের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ টাকা।
প্রকল্পটি জুন ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করে কার্যাদেশ দেওয়ার পর দ্রুত অবকাঠামো স্থাপনের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে থার্ড টার্মিনালের যাত্রীদের পাশাপাশি এয়ারলাইন, বিমানবন্দর পরিচালনাকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ সক্ষমতাও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের নথিতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভবিষ্যৎ যাত্রীচাহিদাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, বিমানবন্দরটি বর্তমানে বছরে প্রায় ৯১ লাখ যাত্রী সেবা দিচ্ছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ১ কোটি ৮৫ লাখে পৌঁছাতে পারে।
একই সঙ্গে প্রতিদিন প্রায় ১৯০টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার পাশাপাশি বিমানবন্দরটি বছরে প্রায় ২ লাখ ৪৮ হাজার মেট্রিক টন কার্গো পরিচালনা করছে।
যাত্রী ও বিমান চলাচল বাড়ার সঙ্গে বিমানবন্দরের টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের ওপর চাপও বাড়বে। ফলে ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে শুরু থেকেই উচ্চক্ষমতার ইনডোর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
থার্ড টার্মিনালের মতো আধুনিক বিমানবন্দরে টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো এখন আর শুধু মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুবিধা নয়; এটি পুরো বিমানবন্দর পরিচালনার ডিজিটাল অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নির্ভরযোগ্য মোবাইল নেটওয়ার্ক ও উচ্চগতির ইন্টারনেট যাত্রীসেবার পাশাপাশি এয়ারলাইন অপারেশন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং এবং ভবিষ্যতের বিভিন্ন স্মার্ট এয়ারপোর্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী Active DAS, ৭০০টি স্মল সেল ও ৬৩৫টি Wi-Fi Access Point চালু হলে শাহজালালের থার্ড টার্মিনালে বড় পরিসরে সমন্বিত ইনডোর টেলিযোগাযোগ কাঠামো তৈরি হবে। তবে এর কার্যকর সুফল নির্ভর করবে প্রকল্পের সময়মতো বাস্তবায়ন, নেটওয়ার্ক ইন্টিগ্রেশন এবং পরবর্তী পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর।
সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)