
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
বাংলাদেশের আকাশ পরিবহন খাতে বড় ধরনের বহর সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালকে ঘিরে বাড়তে থাকা সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক যাত্রীবাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রার সম্মিলিত বহর ২০২৭ সালের মধ্যে বর্তমান ৫১টি থেকে প্রায় ৯১টি উড়োজাহাজে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থাৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তুলনামূলক স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশের চার এয়ারলাইন্সের বহরে আরও প্রায় ৪০টি উড়োজাহাজ যুক্ত হতে পারে। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলোর পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন উড়োজাহাজের বড় অংশই লিজের মাধ্যমে সংগ্রহের কথা রয়েছে।
এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতের ইতিহাসে অন্যতম বড় সমন্বিত বহর সম্প্রসারণ হতে পারে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যাত্রী পরিবহন বাজারে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকাগামী বাংলাদেশি যাত্রীদের একটি বড় অংশ বিদেশি ক্যারিয়ারের মাধ্যমে যাতায়াত করেন।
ফলে দেশের দ্রুত বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক যাত্রীবাজারের বড় অংশ নিজেদের নেটওয়ার্কে ধরে রাখাই দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য অন্যতম বড় সুযোগ।
বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শুধু অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানো নয়, নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্য চালু এবং বিদ্যমান রুটে ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হবে।
তবে শুধু উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়লেই বাজার অংশীদারিত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়বে না। আন্তর্জাতিক রুটে প্রতিযোগিতা করতে ফ্লাইট নেটওয়ার্ক, ভাড়া, সময়সূচি, যাত্রীসেবা এবং নির্ভরযোগ্য অপারেশনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর এই সম্প্রসারণ এমন সময়ে হচ্ছে, যখন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন তৃতীয় টার্মিনালকে ঘিরে দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে।
২০২৫ সালে শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ যাত্রী চলাচল করেছেন। অথচ পুরোনো টার্মিনালগুলোর নকশাগত বার্ষিক সক্ষমতা ছিল প্রায় ৮০ লাখ যাত্রী। ২০২৪ সালে যাত্রীসংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ এবং ২০২৩ সালে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ।
এই ক্রমবর্ধমান যাত্রীচাপ সামাল দিতে তৃতীয় টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত সংযোজন। নতুন টার্মিনালের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক রুটে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর কার্যক্রম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ইতোমধ্যে বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি fleet modernisation programme হাতে নিয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে বিমান Boeing-এর সঙ্গে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে। এর মধ্যে আটটি Boeing 787-10, দুটি 787-9 এবং চারটি 737-8 রয়েছে।
এরপর সেপ্টেম্বরে আরও ১১টি Boeing উড়োজাহাজের অর্ডার ঘোষণা করা হয়েছে—পাঁচটি 787-10 এবং ছয়টি 737-8। এর ফলে Boeing-এর কাছে বিমানের মোট নতুন অর্ডার দাঁড়িয়েছে ২৫টি উড়োজাহাজে।
এখানেই শেষ নয়। সরকার আরও ১০টি Airbus উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। প্রস্তাবিত বহরে চারটি A350-900 এবং ছয়টি A321neo রয়েছে।
তবে এসব কেনা উড়োজাহাজ ২০২৭ সালের বহর সম্প্রসারণের অংশ নয়। Boeing-এর প্রথম নতুন উড়োজাহাজ ২০৩১ সাল থেকে এবং পরিকল্পিত Airbus উড়োজাহাজ ২০৩৩ সাল থেকে আসতে পারে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি চাহিদা মেটাতে বিমান আলাদাভাবে উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
বিমানের নতুন Boeing বহরে wide-body এবং narrow-body—দুই ধরনের উড়োজাহাজই থাকছে।
787-9 উড়োজাহাজগুলো ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দীর্ঘপাল্লার রুটে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে 787-10 উচ্চ যাত্রীচাহিদার মধ্যপ্রাচ্যের রুটে এবং 737-8 মধ্যপ্রাচ্য, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক রুটে ব্যবহারের উপযোগী হিসেবে পরিকল্পনায় রাখা হয়েছে।
এর ফলে বিমান ভবিষ্যতে একই সঙ্গে regional এবং long-haul network সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে।
শুধু রাষ্ট্রীয় বিমান নয়, দেশের বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোও বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।
প্রকাশিত শিল্পপরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউএস-বাংলা, এয়ার অ্যাস্ট্রা ও নভোএয়ারও নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে চার দেশীয় এয়ারলাইন্সের সম্মিলিত বহর ২০২৭ সালে ৯১টিতে পৌঁছাতে পারে।
এ ধরনের সম্প্রসারণ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ফ্লাইট ও আসনসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুটে দেশীয় অপারেটরদের উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করবে।
বড় বহর মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সফল আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন নেটওয়ার্ক নয়। নতুন উড়োজাহাজের সঙ্গে প্রয়োজন পর্যাপ্ত পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সক্ষমতা এবং শক্তিশালী maintenance infrastructure।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে Emirates, Qatar Airways, Turkish Airlines, Etihad Airways, Singapore Airlines বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যাত্রীসেবার মান, সময়ানুবর্তিতা, competitive pricing এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো point-to-point passenger market-এ দীর্ঘপাল্লার রুট টেকসই করতে যাত্রীচাহিদা বিশ্লেষণ, সঠিক aircraft deployment এবং কার্যকর revenue management প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বড় প্রবাসী জনগোষ্ঠী, বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আকাশপথে কার্গো পরিবহনের চাহিদা দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য বড় বাজার তৈরি করেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের নতুন সক্ষমতা এবং দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর বহর সম্প্রসারণ।
পরিকল্পিত ৫১ থেকে ৯১ উড়োজাহাজের সম্প্রসারণ বাস্তবে রূপ নিলে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো আরও বেশি রুট ও ফ্রিকোয়েন্সি পরিচালনার সক্ষমতা পাবে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব কতটা বাড়বে, সেটি শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বহর পরিকল্পনার বাস্তবায়ন, রুট নির্বাচন, পরিচালন দক্ষতা এবং যাত্রীসেবার মানের ওপর।
সব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক বছর বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময় হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়