
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মালয়েশিয়াগামী একদল যাত্রীকে ঘিরে সম্ভাব্য মানবপাচার চক্রের তৎপরতার অভিযোগ সামনে এসেছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ট্যুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ৭৬ জন যাত্রী ওই ফ্লাইটে ওঠেননি। তাদের মধ্যে ১৫ জনকে পাসপোর্ট ও ভিসাসংক্রান্ত অসংগতি পাওয়ার পর বোর্ডিং পর্যায়ে অফলোড করা হয় বলে বিমানবন্দরসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ঘটনাটি ঘিরে বিমানবন্দরের ভেতরে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতা ছিল কি না এবং যাত্রীদের বিদেশ পাঠানোর পেছনে সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্র সক্রিয় ছিল কি না—তা তদন্ত করছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, শনিবার রাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের BG-386 ফ্লাইটে এসব যাত্রীর মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা ছিল। সম্ভাব্য অনিয়মের বিষয়ে আগে থেকেই তথ্য থাকায় সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের ওপর বিশেষ নজরদারি চালানো হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, যাত্রীদের বিমানবন্দরের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করাতে একটি নির্দিষ্ট গোপন সংকেত বা ‘কোড’ ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
চূড়ান্ত যাচাইয়ের সময় কয়েকজন যাত্রীর কাছ থেকে প্রত্যাশিত তথ্য না মেলায় সন্দেহ তৈরি হয় বলে সূত্রের ভাষ্য। এরপর তাদের পাসপোর্ট, ভিসা ও ভ্রমণসংক্রান্ত কাগজপত্র পুনরায় যাচাই করা হয়।
সেই যাচাইয়ে একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
তবে কথিত ‘গোপন কোড’ কী ছিল, সেটি কারা নির্ধারণ করেছিল এবং বিমানবন্দরের কোন পর্যায়ে এটি ব্যবহারের চেষ্টা হয়েছিল—এসব বিষয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
নিরাপত্তার স্বার্থেও এ ধরনের সংকেত বা যাচাই এড়ানোর কৌশলের বিস্তারিত প্রকাশ করা সমীচীন নয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ফ্লাইটটিতে মোট ২৪৫ জন যাত্রীর ভ্রমণের কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত ৭৬ জন যাত্রী বিমানে ওঠেননি।
তাদের মধ্যে ১৫ জনের ভিসা ও পাসপোর্টসংক্রান্ত অসংগতি পাওয়ায় বোর্ডিং পর্যায়ে তাদের অফলোড করা হয় বলে জানা গেছে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চেক-ইন এলাকায় থাকা আরও কয়েকজন যাত্রী বোর্ডিং প্রক্রিয়া শেষ না করেই বিমানবন্দর ত্যাগ করেন বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
তবে ফ্লাইটে না ওঠা ৭৬ জনের সবাই একই চক্রের অংশ ছিলেন—এমনটি এখন পর্যন্ত প্রমাণিত নয়। কারও স্বেচ্ছায় ভ্রমণ বাতিল, কারও অফলোড এবং অন্য কোনো কারণে যাত্রা না করার ঘটনা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
গোয়েন্দা সূত্রের প্রাথমিক ধারণা, সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের একটি অংশ ট্যুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়ায় গিয়ে অনুমোদিত সময় বা ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করে অবস্থান কিংবা কাজ করার পরিকল্পনা করেছিলেন।
রাজধানীর পল্টন এলাকার একটি ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে তাদের ভ্রমণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলেও প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
তবে সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সি বা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা এবং কার কী ভূমিকা ছিল, তা নির্ধারণের বিষয় রয়েছে।
ঘটনার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হচ্ছে—ভ্রমণসংক্রান্ত নথিতে অসংগতি থাকলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীরা কীভাবে বিমানবন্দরের একাধিক যাচাই ধাপ অতিক্রম করে বোর্ডিং পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছালেন।
একজন আন্তর্জাতিক যাত্রীকে সাধারণত এয়ারলাইনের check-in, প্রয়োজনীয় travel document verification, immigration এবং security screening-এর মতো বিভিন্ন প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়।
তবে প্রতিটি সংস্থার দায়িত্ব এক নয়। এয়ারলাইন, ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা সংস্থা ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ নিজ নিজ দায়িত্ব ও আইনি ক্ষমতার আওতায় আলাদা বিষয় যাচাই করে।
ফলে কোনো যাত্রী একটি ধাপ অতিক্রম করেছেন মানেই তার সব নথি সব সংস্থার দৃষ্টিতে চূড়ান্তভাবে বৈধ বলে প্রত্যয়ন করা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তও সঠিক নয়।
এই ঘটনায় কোন পর্যায়ে কী ধরনের যাচাই হয়েছে এবং কোথায় সম্ভাব্য ব্যত্যয় ঘটেছে, সেটিই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তদন্তে বিমানবন্দরের ভেতরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী কথিত চক্রটিকে সহযোগিতা করেছিলেন কি না, সেই অভিযোগও যাচাই করা হচ্ছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একজন অ্যারোড্রাম অপারেটরের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার অভিযোগও সামনে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে অভিযোগ ওঠা মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অপরাধে জড়িত—এমন নয়। তদন্তে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।
বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান জানিয়েছেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ জানিয়েছেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ঘটনার পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক রয়েছে কি না, কারা যাত্রীদের সংগঠিত করেছে এবং বিমানবন্দরের ভেতরে-বাইরে কারও সহযোগিতা ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে।
তদন্ত শেষ হওয়ার আগে মানবপাচার চক্রের আকার বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
ঘটনাটি বিদেশগামী বাংলাদেশিদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
কোনো দেশের tourist visa বা visit visa সাধারণভাবে সেই দেশে চাকরি করার অনুমতি নয়। কর্মসংস্থানের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী উপযুক্ত work visa, work permit বা অন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন লাগতে পারে।
কোনো এজেন্ট যদি পর্যটক হিসেবে প্রবেশের পর সহজেই চাকরি, work permit বা বৈধ অবস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে টাকা বা পাসপোর্ট দেওয়ার আগে সরকারি উৎস থেকে তথ্য যাচাই করা জরুরি।
বিশেষ করে বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা, ভিসার ধরন, চুক্তিপত্র, বেতন, কর্মস্থল এবং প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন যাচাই না করে যাত্রা করলে প্রতারণা ও মানবপাচারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
মানবপাচার প্রতিরোধ শুধু ইমিগ্রেশনের বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এয়ারলাইন, ইমিগ্রেশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
যদি কোনো সংঘবদ্ধ চক্র অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা বা বিশেষ সংকেত ব্যবহার করে স্বাভাবিক যাচাই প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে থাকে, তাহলে সেটি তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে নিরাপত্তা জোরদারের নামে বৈধ পর্যটক বা বৈধ কাগজপত্র নিয়ে বিদেশগামী সাধারণ যাত্রী যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন, সেই ভারসাম্যও বজায় রাখা প্রয়োজন।
এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তদন্তের ফলাফল। কারা যাত্রীদের সংগঠিত করেছিলেন, নথিতে কী ধরনের অসংগতি ছিল, কথিত গোপন সংকেতের বাস্তবতা কী এবং বিমানবন্দরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী এতে যুক্ত ছিলেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তথ্য-প্রমাণভিত্তিক তদন্তেই স্পষ্ট হবে।
অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে মানবপাচারের জন্য দায়ী হিসেবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়।
সূত্র: হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর