
প্রায় ৭৪ বছর আগে আটলান্টিক মহাসাগরে বিধ্বস্ত হওয়া প্যান অ্যামের "ক্লিপার এনডেভার" উড়োজাহাজের ধ্বংসাবশেষ অবশেষে খুঁজে পেয়েছেন অনুসন্ধানকারীরা। ১৯৫২ সালের ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় ৫২ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। বিমান চলাচলের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এই দুর্ঘটনার পরই যাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রি-ফ্লাইট নিরাপত্তা ব্রিফিং চালু করা হয়।
ডিসকভারি চ্যানেলের "এক্সপিডিশন আননোন" এবং এয়ার/সি হেরিটেজ ফাউন্ডেশন যৌথভাবে গত মাসে পুয়ের্তো রিকোর উত্তর উপকূলে সমুদ্রের প্রায় ২ হাজার ফুট গভীরে উড়োজাহাজটির ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করে। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে ডিসকভারি এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
১৯৫২ সালের ১১ এপ্রিল ডগলাস ডিসি-৪ মডেলের উড়োজাহাজটি পুয়ের্তো রিকো থেকে নিউইয়র্কের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। উড়োজাহাজটির ডান পাশের দুটি ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেলে পাইলট জরুরি অবতরণের চেষ্টা করেন। তবে সমুদ্রে অবতরণের মাত্র তিন মিনিটের মধ্যেই উড়োজাহাজটি ডুবে যায়।
দুর্ঘটনার সময় উড়োজাহাজে ৬৪ জন যাত্রী ও পাঁচজন ক্রু সদস্য ছিলেন। প্রাথমিক আঘাত থেকে অনেকেই বেঁচে গেলেও যথাযথ নিরাপত্তা নির্দেশনা না থাকা, ভাষাগত জটিলতা এবং সমন্বিত উদ্ধার কার্যক্রমের অভাবে মাত্র ১৭ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। প্রাণ হারান ৫২ জন।
অনুসন্ধানকারী দল হাই-রেজল্যুশন সোনার প্রযুক্তি এবং একটি স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের ড্রোন ব্যবহার করে গত ২ জুন ধ্বংসাবশেষের অবস্থান শনাক্ত করে। পরে ধারণ করা ছবিতে উড়োজাহাজের গায়ে প্যান অ্যামের পরিচিত লোগো স্পষ্টভাবে দেখা গেলে সেটির পরিচয় নিশ্চিত হয়।
এয়ার/সি হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা রাস ম্যাথিউস বলেন, এই আবিষ্কার একই সঙ্গে আবেগঘন ও ঐতিহাসিক। তাঁর ভাষায়, বহু বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতি নতুন করে সামনে এসেছে।
"এক্সপিডিশন আননোন"-এর উপস্থাপক জশ গেটস জানান, বিশ্বের অত্যাধুনিক সোনার প্রযুক্তিসম্পন্ন একটি গবেষণা জাহাজ তাদের অনুসন্ধানে সহায়তা করে। প্রায় ৩০ ঘণ্টা সমুদ্রতল স্ক্যান করার পর ধ্বংসাবশেষের অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
তবে ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। দুর্ঘটনাস্থলকে নিহতদের শেষ বিশ্রামস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এয়ার/সি হেরিটেজ ফাউন্ডেশন এখন পুয়ের্তো রিকো সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে স্থানটি সংরক্ষণ এবং নিহতদের স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।
দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া দুজনের মধ্যে বর্তমানে জীবিত রয়েছেন ১০২ বছর বয়সী এক নারী, যিনি সে সময় নার্স হিসেবে কাজ করতেন এবং দুর্ঘটনার পর উড়োজাহাজের দরজা খুলে যাত্রীদের বের হতে সহায়তা করেছিলেন। অপরজন ছিলেন এক শিশু, যাকে সমুদ্রের পানিতে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
দুর্ঘটনার তদন্তের পর যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন সিভিল অ্যারোনটিক্স বোর্ড বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সুপারিশ করে। এরই ধারাবাহিকতায় যাত্রীদের লাইফ ভেস্ট, লাইফ রাফট এবং জরুরি নির্গমনপথ ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে উড্ডয়নের আগে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা ব্রিফিং চালু হয়, যা আজও বিশ্বের প্রায় সব বাণিজ্যিক ফ্লাইটে অনুসরণ করা হয়।
জশ গেটস বলেন, “আজ আমরা যখন উড়োজাহাজে ওঠার আগে নিরাপত্তা নির্দেশনা শুনি, তখন তার পেছনে রয়েছে ‘ক্লিপার এনডেভার’-এর সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকে নেওয়া শিক্ষা।”