
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
আজকের ব্যস্ত ঢাকা শহরের বুকে তেজগাঁও বিমানবন্দর অনেকের কাছে কেবল একটি সামরিক বিমানঘাঁটি। কিন্তু বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচলের ইতিহাস খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় এই বিমানবন্দরেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সামরিক প্রয়োজন থেকে যাত্রা শুরু করা তেজগাঁও একসময় হয়ে উঠেছিল ঢাকার প্রধান বেসামরিক বিমানবন্দর এবং আন্তর্জাতিক আকাশপথে দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার।
স্বাধীনতার পরও কয়েক বছর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের কেন্দ্র ছিল তেজগাঁও। এখান দিয়ে যাতায়াত করেছেন সাধারণ যাত্রী থেকে শুরু করে বিদেশি অতিথি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের শুরুর দিনের অপারেশনও জড়িয়ে আছে এই বিমানবন্দরের সঙ্গে।
কিন্তু ক্রমবর্ধমান যাত্রীচাপ, বড় উড়োজাহাজ পরিচালনার প্রয়োজন এবং সম্প্রসারণের সীমাবদ্ধতায় একসময় তেজগাঁওকে পেছনে ফেলে কুর্মিটোলায় গড়ে ওঠে নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
তেজগাঁও বিমানবন্দরের গোড়ার ইতিহাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত। চল্লিশের দশকের শুরুতে ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকায় সামরিক বিমান পরিচালনার জন্য বিমানঘাঁটি ও রানওয়ে অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়।
সে সময় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে বিমান পরিচালনার জন্য এই অঞ্চলের বিমানঘাঁটিগুলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ঢাকা থেকেও বার্মা তথা বর্তমান মিয়ানমার অঞ্চলের যুদ্ধ কার্যক্রমে সহায়তার সুযোগ ছিল।
প্রাথমিকভাবে সামরিক প্রয়োজনে গড়ে উঠলেও যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তেজগাঁওয়ের গুরুত্ব বদলে যায়। ধীরে ধীরে এটি বেসামরিক বিমান চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে তেজগাঁও বিমানবন্দরের গুরুত্বও দ্রুত বাড়তে থাকে।
ঢাকার অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে তেজগাঁও ব্যবহৃত হতে থাকে। তৎকালীন পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গন্তব্যের সঙ্গেও ঢাকা আকাশপথে যুক্ত হয়।
পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের (PIA) কার্যক্রম এবং বিদেশি ক্যারিয়ারের আন্তর্জাতিক সংযোগ তেজগাঁওকে এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরে পরিণত করে।
বিশ্ব এভিয়েশনে পঞ্চাশ ও ষাটের দশক ছিল দ্রুত পরিবর্তনের সময়। প্রপেলারচালিত যাত্রীবাহী বিমানের জায়গায় ক্রমেই বড় ও দ্রুতগতির জেট উড়োজাহাজ আসতে শুরু করে।
আর এখানেই তেজগাঁও বিমানবন্দরের ভবিষ্যৎ সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হতে থাকে।
বড় উড়োজাহাজের জন্য দীর্ঘ রানওয়ে, উন্নত ট্যাক্সিওয়ে, বেশি অ্যাপ্রন স্পেস, আধুনিক টার্মিনাল এবং উন্নত নেভিগেশন সুবিধা প্রয়োজন ছিল। একই সঙ্গে ঢাকার যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের চাহিদাও বাড়ছিল।
কিন্তু তেজগাঁওয়ের চারপাশে নগরায়ণ বাড়তে থাকায় বিমানবন্দরটির বড় পরিসরে সম্প্রসারণ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তেজগাঁও বিমানবন্দরের ইতিহাসের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
যুদ্ধের সময় বিমানবন্দরটি কৌশলগত সামরিক স্থাপনা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ পুনরুদ্ধারেও তেজগাঁও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্বাধীন বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন প্রতিষ্ঠার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রাথমিক কার্যক্রমও তেজগাঁও বিমানবন্দরকেন্দ্রিক ছিল।
সদ্য স্বাধীন একটি দেশের আন্তর্জাতিক আকাশ যোগাযোগ পুনর্গঠনের সেই সময়ে তেজগাঁও কার্যত বাংলাদেশের প্রধান এভিয়েশন গেটওয়ের ভূমিকা পালন করে।
তেজগাঁও বিমানবন্দরের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সীমাবদ্ধতা।
ঢাকা শহর দ্রুত বড় হচ্ছিল। বিমানবন্দরের চারপাশে জনবসতি ও স্থাপনা বাড়ার পাশাপাশি বড় আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির চাপও বাড়ছিল।
আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন তখন দ্রুত wide-body aircraft-এর যুগে প্রবেশ করছে। বেশি যাত্রী বহনকারী এসব উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য বড় বিমানবন্দর প্রয়োজন।
তেজগাঁওয়ে রানওয়ে ও টার্মিনাল সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত থাকায় ঢাকার জন্য নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনা গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
তেজগাঁওয়ের সীমাবদ্ধতার সমাধান হিসেবে কুর্মিটোলা এলাকায় নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
স্বাধীনতার আগে শুরু হওয়া পরিকল্পনাটি স্বাধীনতার পর এগিয়ে নেওয়া হয়। ফরাসি কারিগরি সহায়তাও প্রকল্পটির বাস্তবায়নে যুক্ত ছিল।
অবশেষে ১৯৮০ সালে নতুন বিমানবন্দর চালুর মধ্য দিয়ে ঢাকার বেসামরিক বিমান চলাচলের প্রধান কেন্দ্র তেজগাঁও থেকে কুর্মিটোলায় স্থানান্তরিত হয়।
নতুন বিমানবন্দরটি প্রথমে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নামে পরিচিত ছিল। পরে এর নাম হয় জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ২০১০ সালে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে সেই কুর্মিটোলার বিমানবন্দরই দেশের প্রধান এভিয়েশন গেটওয়ের দায়িত্ব পালন করছে।
কুর্মিটোলায় নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হওয়ার পর তেজগাঁওয়ের নিয়মিত বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমানবন্দর হিসেবে ভূমিকা শেষ হয়ে যায়।
পরবর্তীতে বিমানবন্দরটি মূলত বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়। বর্তমানে এলাকাটি সামরিক বিমান চলাচল ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের বিভিন্ন কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অর্থাৎ যে রানওয়ে একসময় আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী উড়োজাহাজকে ঢাকায় স্বাগত জানাত, সেটি এখন আর সাধারণ যাত্রীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নয়।
তেজগাঁও বিমানবন্দরের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ১৯৭৭ সালে।
জাপান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৪৭২ ছিনতাই করে ঢাকায় নিয়ে আসে জাপানিজ রেড আর্মির সদস্যরা। ছিনতাই হওয়া উড়োজাহাজটি তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবস্থান নেয় এবং যাত্রীদের মুক্ত করা নিয়ে কয়েক দিন ধরে চলে টানটান আলোচনা।
ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের নজর ঢাকার দিকে নিয়ে আসে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত জটিল একটি আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা সংকট।
ফলে তেজগাঁও শুধু বাংলাদেশের এভিয়েশন বিকাশের নয়, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের একটি বহুল আলোচিত ঘটনারও সাক্ষী হয়ে আছে।
বাংলাদেশের এভিয়েশনের অগ্রগতির দিকে তাকালে তেজগাঁও বিমানবন্দর এবং বর্তমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা দেখা যায়।
যে ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ একসময় তেজগাঁওয়ের একটি তুলনামূলক ছোট বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হতো, সেই শহরেই এখন বিশাল পরিসরের থার্ড টার্মিনাল নির্মিত হয়েছে।
উড়োজাহাজের প্রযুক্তি বদলেছে, যাত্রীসংখ্যা বেড়েছে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবার ধারণা পাল্টেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বের আকাশ যোগাযোগও বহুগুণ বিস্তৃত হয়েছে।
কিন্তু এই দীর্ঘ যাত্রার শুরুর অধ্যায়গুলোর বড় একটি অংশ লেখা হয়েছিল তেজগাঁওয়ের রানওয়েতে।
আজ সেখানে সাধারণ আন্তর্জাতিক যাত্রীদের আনাগোনা নেই। নেই আগের মতো নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইটের ব্যস্ততা। তারপরও বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচলের ইতিহাসে তেজগাঁও বিমানবন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা—যার রানওয়ে থেকেই আধুনিক বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আকাশযাত্রার প্রথম অধ্যায়গুলোর সূচনা হয়েছিল।
সূত্র: বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচলের ঐতিহাসিক তথ্য, বিমানবন্দর ইতিহাস ও প্রকাশিত আর্কাইভ