
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার ও দেশের বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনা করলেও নির্ধারিত ওভারফ্লাইট ও ল্যান্ডিং চার্জ পরিশোধ করেনি বেশ কয়েকটি বিদেশি এয়ারলাইনস। ছোট-বড় মিলিয়ে ২৭টি বিদেশি এয়ারলাইনসের কাছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পাওনা প্রায় ৯২ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১১৪ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে এসব অর্থ বকেয়া থাকায় রাজস্ব আদায়ে জটিলতার মুখে পড়েছে সংস্থাটি।
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, মোট বকেয়ার একটি বড় অংশ আটকে রয়েছে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া ১৮টি বিদেশি এয়ারলাইনসের কাছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘদিনের পাওনা প্রায় ৬৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। অন্যদিকে বাংলাদেশে এখনো নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করছে, এমন তিনটি বিদেশি এয়ারলাইনসের কাছেও বকেয়া রয়েছে প্রায় ৪২ কোটি টাকা।
বকেয়া থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাওনা রয়েছে ভারতের বেসরকারি বিমান সংস্থা স্পাইসজেটের কাছে। ২০২১ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ল্যান্ডিং ও ওভারফ্লাইট চার্জ বাবদ এয়ারলাইনসটির কাছে বেবিচকের পাওনা প্রায় ৩৪ কোটি টাকা।
দীর্ঘ সময় ধরে পাওনা পরিশোধ না হওয়ায় স্পাইসজেটের বকেয়া অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে সর্বশেষ কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী বিদেশি উড়োজাহাজগুলোর কাছ থেকে নির্ধারিত নিয়মে ওভারফ্লাইট চার্জ আদায় করে বেবিচক। কোনো বিদেশি উড়োজাহাজ বাংলাদেশের আকাশসীমা অতিক্রম করে অন্য দেশে যাতায়াত করলেও দেশের কোনো বিমানবন্দরে অবতরণ না করলে এ চার্জ প্রযোজ্য হয়।
উড়োজাহাজের আকার ও ওজনের ভিত্তিতে প্রতিবার আকাশসীমা অতিক্রমের জন্য প্রায় ৩০০ থেকে ৪৫০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত চার্জ নির্ধারিত রয়েছে। বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রবেশ থেকে বের হওয়া পর্যন্ত একটি যাত্রার জন্য একবারই এ চার্জ প্রযোজ্য হয়।
নিয়ম অনুযায়ী, বিল ইস্যুর ১৪ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসকে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে হয়। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল পরিশোধ না করায় বছরের পর বছর বকেয়া জমেছে।
পাওনা আদায়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাসের মাধ্যমে একাধিকবার যোগাযোগ করেছে বেবিচক। সর্বশেষ গত জুনেও বকেয়া পরিশোধের জন্য তাগিদপত্র পাঠানো হয়েছে। তবে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং দেউলিয়া হয়ে পড়া এয়ারলাইনসগুলোর কাছ থেকে অর্থ আদায় কঠিন হয়ে পড়েছে।
কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থ আদায়ের সুযোগ থাকলেও মামলা পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় মূল পাওনার তুলনায় বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এসব বকেয়া আদায়ে আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এদিকে বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ বকেয়া থাকলেও বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার থেকে রাজস্ব আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
বেবিচকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ওভারফ্লাইট চার্জ বাবদ আয় হয়েছে ৫৫৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ আয় ছিল ৫০২ কোটি ৩২ লাখ টাকা। আর ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আয় হয়েছিল ৪৪৩ কোটি ১২ লাখ টাকা।
অর্থাৎ ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে ওভারফ্লাইট চার্জ থেকে আয় বেড়েছে ৫৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা, যা প্রায় ১১ দশমিক ২১ শতাংশ বেশি।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী উড়োজাহাজের সংখ্যাও বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে মোট ১ লাখ ২১ হাজার ৫১৬টি ফ্লাইট বাংলাদেশের আকাশসীমা অতিক্রম করেছে। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৪টি। অর্থাৎ এক বছরে ফ্লাইট বেড়েছে ৫ হাজার ৪৬২টি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারিতে নতুন রাডার ব্যবস্থা চালুর ফলে বাংলাদেশের আকাশসীমায় উড়োজাহাজ পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা বেড়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আয়েও।
তবে আন্তর্জাতিক মানের স্বয়ংক্রিয় বিলিং ও পেমেন্ট ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু না থাকায় বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর কাছ থেকে নির্ধারিত সময়ে অর্থ আদায়ে এখনো দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে।
বিমান চলাচল খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, আকাশসীমা ব্যবহার থেকে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বকেয়া আদায়ের প্রক্রিয়াও আধুনিক করা প্রয়োজন। বিশেষ করে স্বয়ংক্রিয় বিলিং ও পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু, নিয়মিত বকেয়া পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করা হলে পাওনা আদায়ে অগ্রগতি আসতে পারে।
বাংলাদেশের আকাশসীমায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ওভারফ্লাইট চার্জ থেকে রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনাও বাড়ছে। তবে এ সম্ভাবনার পূর্ণ সুফল পেতে নির্ধারিত সময়ে বিল আদায় এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া নিষ্পত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।