
এভিয়েশন বার্তা ডেস্ক
আকাশপথে ভ্রমণের সময় আমরা বিভিন্ন আকারের উড়োজাহাজ দেখতে পাই। কোনোটি আকারে বিশাল, আবার কোনোটি তুলনামূলক ছোট। বিমান চলাচল শিল্পে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজকে কেবিনের গঠন ও প্রস্থের ভিত্তিতে সাধারণত ওয়াইড-বডি (Wide-body) এবং ন্যারো-বডি (Narrow-body)—এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। তবে এই দুই ধরনের উড়োজাহাজের মধ্যে পার্থক্য শুধু আকারেই সীমাবদ্ধ নয়; যাত্রী ধারণক্ষমতা, আসন বিন্যাস, কার্গো পরিবহন এবং পরিচালন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।
ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ কী?
ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ হলো তুলনামূলক প্রশস্ত কাঠামোর যাত্রীবাহী বিমান, যার কেবিনে সাধারণত দুটি আইল বা যাত্রীদের চলাচলের পথ থাকে। এসব উড়োজাহাজে আসনের সারিগুলো দুটি আইলের মাধ্যমে তিনটি অংশে বিভক্ত থাকে।
সাধারণত ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজে ২০০ থেকে ৫০০ জন বা তার বেশি যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব। তবে যাত্রী ধারণক্ষমতা নির্ভর করে উড়োজাহাজের মডেল এবং বিমান সংস্থার নির্ধারিত আসন বিন্যাসের ওপর।
বোয়িং ৭৭৭, বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার, এয়ারবাস A330, A350 এবং A380 ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজের পরিচিত উদাহরণ।
এসব উড়োজাহাজ সাধারণত দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে যাত্রী পরিবহনে ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে যাত্রী চাহিদা বেশি থাকলে স্বল্প দূরত্বের রুটেও এগুলো পরিচালিত হয়।
বড় আকারের কারণে এসব উড়োজাহাজে তুলনামূলক বেশি যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের সুযোগ থাকে। পাশাপাশি দীর্ঘ ফ্লাইটে যাত্রীদের জন্য বিভিন্ন শ্রেণির আসন, উন্নত বিনোদনব্যবস্থা এবং অন্যান্য সুবিধা রাখা সম্ভব হয়।
ন্যারো-বডি উড়োজাহাজ কী?
ন্যারো-বডি উড়োজাহাজের মূল কাঠামো তুলনামূলক সরু এবং যাত্রী কেবিনে সাধারণত একটি আইল থাকে। আইলের দুই পাশে যাত্রীদের আসন সাজানো হয়।
বোয়িং ৭৩৭ এবং এয়ারবাস A320 পরিবারের উড়োজাহাজগুলো ন্যারো-বডির সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। এসব উড়োজাহাজে সাধারণত ১০০ থেকে ২৪০ জনের মতো যাত্রী পরিবহন করা যায়। তবে কিছু ছোট ন্যারো-বডি উড়োজাহাজের ধারণক্ষমতা এর চেয়েও কম।
ন্যারো-বডি উড়োজাহাজ প্রধানত অভ্যন্তরীণ ও স্বল্প থেকে মাঝারি দূরত্বের আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ব্যবহৃত হয়। তুলনামূলক কম যাত্রী চাহিদার রুটে এসব উড়োজাহাজ পরিচালনা অনেক ক্ষেত্রে বেশি সাশ্রয়ী।
তবে আধুনিক প্রযুক্তির কারণে ন্যারো-বডি উড়োজাহাজের সক্ষমতাও বাড়ছে। এয়ারবাস A321XLR-এর মতো উড়োজাহাজ দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য তৈরি করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে শুধু ফ্লাইটের দূরত্ব দিয়ে ওয়াইড-বডি ও ন্যারো-বডির পার্থক্য নির্ধারণ করা যায় না।
দুই ধরনের উড়োজাহাজের প্রধান পার্থক্য
ওয়াইড-বডি ও ন্যারো-বডি উড়োজাহাজের সবচেয়ে সহজ পার্থক্য হলো কেবিনের আইল সংখ্যা। ওয়াইড-বডিতে সাধারণত দুটি আইল থাকে, আর ন্যারো-বডিতে থাকে একটি।
ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজে যাত্রী ধারণক্ষমতা বেশি হওয়ায় একসঙ্গে অধিকসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব। অন্যদিকে ন্যারো-বডি উড়োজাহাজ তুলনামূলক কম যাত্রী নিয়ে পরিচালিত হয়।
জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে। বড় আকার ও ওজনের কারণে ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজের একটি ফ্লাইটে মোট জ্বালানি খরচ সাধারণত বেশি হয়। তবে অধিকসংখ্যক যাত্রী পরিবহনের ফলে যাত্রীপ্রতি খরচ অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে।
অন্যদিকে ন্যারো-বডি উড়োজাহাজের মোট পরিচালন ব্যয় সাধারণত কম। ফলে তুলনামূলক কম যাত্রী চাহিদার রুটে বিমান সংস্থাগুলো এসব উড়োজাহাজ ব্যবহার করে থাকে।
কার্গো পরিবহনের ক্ষেত্রেও ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ সুবিধাজনক। যাত্রীদের লাগেজের পাশাপাশি বিমানের নিচের অংশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা যায়।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে কোন ধরনের উড়োজাহাজ রয়েছে?
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরেও ওয়াইড-বডি ও ন্যারো-বডি—উভয় ধরনের উড়োজাহাজ রয়েছে।
বিমানের বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার ও বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর ওয়াইড-বডি শ্রেণির উড়োজাহাজ। এসব বিমান মূলত দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী পরিবহনে ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে বোয়িং ৭৩৭-৮০০ ন্যারো-বডি শ্রেণির উড়োজাহাজ। এটি অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক আন্তর্জাতিক রুটে ব্যবহৃত হয়।
এ ছাড়া বিমানের বহরে ড্যাশ ৮-৪০০ মডেলের টার্বোপ্রপ উড়োজাহাজও রয়েছে। এগুলো তুলনামূলক ছোট আকারের এবং মূলত স্বল্প দূরত্বের ফ্লাইট পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়।
কোন ধরনের উড়োজাহাজ বেশি নিরাপদ?
অনেক যাত্রীর ধারণা, বড় উড়োজাহাজ ছোট উড়োজাহাজের তুলনায় বেশি নিরাপদ। তবে শুধু উড়োজাহাজের আকার দিয়ে নিরাপত্তা নির্ধারণ করা যায় না।
ওয়াইড-বডি ও ন্যারো-বডি—উভয় ধরনের উড়োজাহাজকেই নির্ধারিত আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল নিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণ করতে হয়।
উড়োজাহাজের নিরাপত্তা মূলত নির্ভর করে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, পাইলটদের প্রশিক্ষণ, আবহাওয়া পরিস্থিতি, পরিচালন পদ্ধতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকির ওপর।
ফলে আধুনিক ওয়াইড-বডি ও ন্যারো-বডি উভয় ধরনের উড়োজাহাজই নির্ধারিত নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে পরিচালিত হলে নিরাপদ বিমানভ্রমণের উপযোগী।
বিমান সংস্থাগুলো কোনটি বেশি পছন্দ করে?
বিমান সংস্থাগুলো সাধারণত রুটের দূরত্ব, যাত্রী চাহিদা, কার্গো পরিবহনের সুযোগ এবং পরিচালন ব্যয় বিবেচনা করে উড়োজাহাজ নির্বাচন করে।
যেসব রুটে যাত্রী চাহিদা বেশি এবং দীর্ঘ দূরত্বে ফ্লাইট পরিচালনা করতে হয়, সেখানে ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। অন্যদিকে স্বল্প ও মাঝারি দূরত্বের রুটে তুলনামূলক কম খরচে ঘন ঘন ফ্লাইট পরিচালনার জন্য ন্যারো-বডি উড়োজাহাজ কার্যকর।
আধুনিক প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে দুই ধরনের উড়োজাহাজই আগের তুলনায় বেশি জ্বালানিসাশ্রয়ী ও দক্ষ হয়ে উঠছে। তাই ভবিষ্যতের বিমান পরিবহন ব্যবস্থায় ওয়াইড-বডি ও ন্যারো-বডি উভয় ধরনের উড়োজাহাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অব্যাহত থাকবে।